চীনের এআই পুলিশে নতুন দিগন্ত: মুখের দিকে তাকালেই ফাঁস হবে অপরাধের ছক!

চীনের প্রযুক্তি খাতের এক নতুন উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এখন কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরেই নয়, বরং অপরাধীর সুপ্ত উদ্দেশ্য অথবা তার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা মুহূর্তের মধ্যেই শনাক্ত করতে সক্ষম। গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক পুলিশ ও সন্ত্রাসবিরোধী প্রযুক্তি প্রদর্শনীতে এমন কিছু বিস্ময়কর ও উন্নত এআই প্রযুক্তির উন্মোচন করা হয়েছে, যা কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রকেও হার মানায়। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (এসসিএমপি)-এর একটি প্রতিবেদনে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

শরীরের ভেতরের খবর দেবে তিয়ানদির ক্যামেরা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের তিয়ানজিন ভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তিয়ানদি এমন একটি ক্যামেরা তৈরি করেছে, যা এর সামনে দাঁড়ানো মানুষের শরীরের ভেতরের তথ্য প্রকাশ করতে পারে। মাত্র ১০ সেকেন্ড এই ক্যামেরার সামনে অবস্থান করলেই ডিভাইসটি নির্ভুলভাবে ব্যক্তির হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা এবং রক্তপ্রবাহের গতি পরিমাপ করতে পারে।

কোম্পানির দাবি, এই পরীক্ষার ফলাফল ৯০ শতাংশেরও বেশি নির্ভুল। সন্দেহভাজন ব্যক্তির লাইভ ছবির পাশেই স্ক্রিনে তার শারীরিক সূচকগুলো প্রদর্শিত হয়। যদি রক্তচাপ বা হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি হয়, তবে স্ক্রিনে লাল বা হলুদ রঙে সতর্কবার্তা ভেসে ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নির্ধারিত প্রতীক্ষা কক্ষে মাত্র চারটি ক্যামেরা স্থাপন করে একসঙ্গে ২৪ জন মানুষের ওপর নজর রাখা সম্ভব। এর মাধ্যমে কোনো বন্দির হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি বা হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরি পরিস্থিতি আগেভাগেই শনাক্ত করা যায়।

এই প্রযুক্তি শুধু অপরাধীদের ওপরই নয়, পুলিশের কার্যক্রমের ওপরও নজর রাখে। যদি কোনো বন্দিকে একা ফেলে রাখা হয় অথবা প্রোটোকল ভেঙে মাত্র একজন কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করেন, তবে এটি তাৎক্ষণিকভাবে প্রোটোকল লঙ্ঘনের অ্যালার্ম বাজিয়ে দেয়।

মুখের অবয়ব দেখে মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ

আরেকটি চীনা প্রতিষ্ঠান, লিয়ানশিন টেকনোলজি, আরও এক ধাপ এগিয়ে থাকা প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে। তাদের তৈরি এআই ক্যামেরা এবং সাইকোলজিক্যাল ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (এলএলএম) মানুষের মুখের অবয়ব বিশ্লেষণ করে তার মানসিক অবস্থা নির্ণয় করতে পারে। যদি কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি এই ক্যামেরার দিকে মাত্র ৮ থেকে ১২ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকেন, তবেই সিস্টেমটি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মানসিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যের দুর্বলতা এবং ভেতরের আসল অপরাধী সত্তা বা মূল অনুপ্রেরণা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।

ওই ব্যক্তি কোনো তীব্র মানসিক সংকটে ভুগছেন কি না, অথবা তার অপরাধ করার বা মিথ্যা বলার প্রবণতা কতটুকু, তার একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নিমেষেই তৈরি হয়ে যায়। এই অতি-আধুনিক সিস্টেমটি প্রায় ৮০ মিলিয়ন (৮ কোটি) মানুষের ডেটা বা নমুনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি চীনের শীর্ষ সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। ইতিমধ্যেই চীনের ৩০টিরও বেশি পুলিশ স্টেশনে এই প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফ্রন্টলাইন পুলিশ কর্মকর্তাদের সহায়তা

উদ্যোক্তাদের মতে, ফ্রন্টলাইন পুলিশ কর্মকর্তাদের তীব্র ঘাটতি মেটাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজের অতিরিক্ত চাপ ও ক্লান্তির কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্মক্ষমতা ও জিজ্ঞাসাবাদের দক্ষতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এই ‘কন্ট্যাক্টলেস’ বা স্পর্শহীন এআই প্রযুক্তি কর্মকর্তাদের মানসিক চাপ কমাবে এবং কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা উচিত কি না, তা চোখের পলকে নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে।

ত্বক পরীক্ষা করে সততা যাচাই

মধ্য চীনের হেফেই ভিত্তিক কোম্পানি আনহুই উইউ সিকিউরিটি টেকনোলজি-র প্রযুক্তি আরও উন্নত। তারা সাধারণ ক্যামেরার মাধ্যমে মানুষের ছবি ও কণ্ঠস্বর ধারণ করে তার সততা, নীতি-নৈতিকতা এবং মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করছে। প্রতিষ্ঠানটি এমন এক বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করে যা মানুষের ত্বকের ওপর আলো বা বর্ণালীর প্রতিফলন পরীক্ষা করে। মানুষের খালি চোখে যা ধরা পড়ে না, এই ক্যামেরা সেই সূক্ষ্ম রক্ত চলাচলের পরিবর্তন নিখুঁতভাবে ধরতে পারে।

বর্তমানে চীনের ২০টিরও বেশি প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা, সীমান্ত চৌকি এবং দুর্নীতি দমন বিভাগে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই এআই প্রযুক্তি দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড ও সততা যাচাই করা হচ্ছে।

চীনের এই নতুন উদ্ভাবন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী বিপ্লব নিয়ে এসেছে। তবে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও আবেগের ওপর এআই-এর এই একচ্ছত্র নজরদারি ভবিষ্যৎ অপরাধ দমনের ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিচ্ছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত