আইসিইউতে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উদ্বেগজনক

দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ওষুধ-প্রতিরোধী বা ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঘটছে, যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত দুটি গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার ফলাফলগুলো আন্তর্জাতিক সাময়িকী মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমে এই মারাত্মক সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

গবেষণাটি ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ভর্তি ৩৬৩ জন নবজাতকের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশের অন্ত্রে ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালে ভর্তির সময় ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জন, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ রোগী আইসিইউতে থাকাকালীন নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন। গবেষকরা একে হাসপাতালের ভেতরে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। এছাড়া, যাদের শরীরে কালচার পরীক্ষায় এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, তাদের ৯০ শতাংশেরও বেশি মারা গেছেন।

এই ব্যাকটেরিয়াগুলো বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকে সাড়া দেয় না, ফলে নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং ক্ষতের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষকদের মতে, আইসিইউ সেবার সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং এর ফলে সৃষ্ট নোসোকোমিয়াল ইনফেকশনের ঝুঁকি মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা গেছে, অনেক রোগীর শরীরে শুরুতে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ব্যাকটেরিয়া পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে গবেষণার দ্বিতীয় অংশে ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। ঢাকার একটি এনআইসিইউতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, হাত ধোয়ার অভ্যাস, পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ফলে সাত মাসে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ৮৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি ১০০ জন ভর্তি নবজাতকের মধ্যে মৃত্যুহার ২৬ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে এসেছে।

আইসিডিডিআরবি-র সহকারী বিজ্ঞানী এবং গবেষণার প্রধান লেখক ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন জানান, তারা পুরো সময়জুড়ে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে রোগীর বহন করা ব্যাকটেরিয়া ও পরবর্তী প্রাণঘাতী সংক্রমণের সম্পর্ক চিহ্নিত করেছেন। আইসিডিডিআরবি-র এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ভর্তির সময় সুস্থ থাকা রোগীদের অর্ধেকের বেশি আইসিইউতে থাকাকালীন আক্রান্ত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইসিডিডিআরবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই সংক্রমণ প্রতিরোধ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, নজরদারি এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকে রোগীর সুরক্ষার মূল অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।