রাজধানীর প্রতিটি খাতে এখন চাঁদাবাজদের থাবা। কেবল বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, ফুটপাত, কাঁচাবাজার, পরিবহন, অটোরিকশা, নদীর ঘাট এমনকি ময়লা ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির বিস্তার ঘটেছে। আগে যেখানে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা মাফিয়া গডফাদারদের আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে টোকাইরাও চাঁদাবাজিতে নেমেছে। এই নব্য চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীবাসী আজ পুরোপুরি জিম্মি। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকাগুলো সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয়তা ও অপরাধ দমনে ব্যর্থতার কারণে এসব এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলেছে।
চাঁদা না দিলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিয়ত মারধর, হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা শুরু কিংবা মাছ ধরার মতো সাধারণ কাজেও চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাজনৈতিক কর্মীসহ অনেকেই প্রকাশ্যে খুনের শিকার হচ্ছেন। গত এক বছরে পল্লবীতে যুবদল নেতা ইউসুফ ও গোলাম কিবরিয়া, কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির এবং মৌচাকে বেল্লাল হোসেনের মতো আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে চাঁদাবাজির মতো কারণ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশে ৬৯৬টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে এবং ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির তথ্যমতে, কেবল ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই চার মাসে রাজধানীতে ২৩৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৫৮টি, এপ্রিলে ৭১টি এবং মে মাসে ৬১টি মামলা দায়ের হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের দৈনিক আয়ের বড় একটি অংশ চাঁদা হিসেবে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। যাত্রাবাড়ীর মাছ ব্যবসায়ী জাকির হোসেন দীর্ঘ ২০ বছর ব্যবসা করার পর চলতি বছরের এপ্রিলে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাকে দোকানের দখল রাখতে ১৫ লাখ টাকা এবং প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিএনপি নেতা নবীউল্লাহ নবীর নির্বাচনি এলাকা হওয়া সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় শতাধিক চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে বলে গোয়েন্দা পুলিশের দাবি।
সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, জনপদের মোড় ও ধলপুর এলাকায় পরিবহন, বাজার ও ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে। ওই এলাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন পরিবহনকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা গুনতে হয়, যা স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে পুলিশ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়। নিউমার্কেট এলাকাতেও দোকান দখল, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ বিল, পার্কিং ফি ও মাসিক ভাড়ার নামে চাঁদাবাজি চরম আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের পতনের পর নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল ও তার বাহিনী চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা ফুটপাতে থাকা প্রায় ৫০০ দোকান থেকে কোনো কাগজপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎ বিলের নামে প্রতি দোকান থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং পার্কিংয়ের নামে গাড়িপ্রতি ২০ টাকা আদায় করছে। সিটি করপোরেশনের লোগো সম্বলিত রসিদ ব্যবহার করা হলেও এই অর্থ করপোরেশনে জমা হয় না। মকবুলের লোকজন ফুটপাতের ১৫০টি দোকান দখল করে ভাড়া দিয়েছে এবং প্রতিটি দোকান থেকে অগ্রিম হিসেবে তিন লাখ টাকা এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করছে।
গত ২৯ জুলাই মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সবুজবাগ ও হাজারীবাগে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকেই নির্দেশ করে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, জুন মাস পর্যন্ত রাজধানীতে ১২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার গড় হার প্রতি মাসে প্রায় ২০টি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দখলবাণিজ্যের পাশাপাশি চাঁদাবাজির সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন হকার জানান, পুরো নিউ মার্কেট এলাকায় ফুটপাতে ৮০০ থেকে ৮৫০ হকার রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের কাছে থেকে মাসে ভাড়া বাবদ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা তুলে নিচ্ছে মকবুলের লোকজন।

