যুদ্ধের বড় ধাক্কা শ্রমবাজারে: মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠানোয় ৪১% পতন

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে যুদ্ধের প্রভাব

করোনা মহামারির সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোয় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছিল। সেই সংকট কাটিয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোয় আবারও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, যা এই খাতকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে। একই সঙ্গে, যুদ্ধের কারণে বহু শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতি দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসকে নতুন করে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব, কুয়েত এবং কাতারের মতো প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে নতুন কর্মীর চাহিদা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত তিন মাসে মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। অথচ এর আগের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪১ শতাংশ কমেছে, যা শ্রমবাজারের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যটন, সেবা এবং বাণিজ্য খাতের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এই সতর্কতার কারণে নতুন করে শ্রমিক নেওয়ার অনুমোদনের হার কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে, যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে মধ্যপ্রাচ্যগামী শত শত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রাও বিলম্বিত হচ্ছে। আগে যেখানে ন্যূনতম বিমানভাড়া ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা ছিল, ফ্লাইট সংকটের কারণে তা এখন বেড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজার ও কর্মী প্রবাহের চিত্র

বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে সৌদি আরবেই বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিক যান।

২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার জন শুধু সৌদি আরবে গেছেন। এছাড়া, কাতারে গেছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার এবং কুয়েতে ৪২ হাজার ৪৯৬ জন।

অন্যদিকে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল ৫ জুন পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৬২ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরব গেছেন ১ লাখ ৯০ হাজার ৭২ জন, কাতারে ২৩ হাজার ৭৮০ জন, কুয়েতে ৮ হাজার ৭৫৩ জন, জর্ডানে ৭ হাজার ৩৫৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭ হাজার ১২১ জন এবং ইরাকে ৩ হাজার ৯১ জন। এই পরিসংখ্যান মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে।

পূর্ববর্তী বছরগুলোর চিত্র

  • ২০২২ সাল: করোনা পরবর্তী সময়ে মোট ১১ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৮ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান। এর মধ্যে সৌদি আরব ছিল সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার, যেখানে গেছেন ৩ লাখ ৯১ হাজার ৩০২ জন কর্মী। ওমানে ১ লাখ ৬৩ হাজার ২১ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭৭ হাজার ৪৭৬ জন, কুয়েতে ২৯ হাজার ৯ জন এবং কাতারে ২৭ হাজার ৬৬৩ জন কর্মী গেছেন।
  • ২০২৩ সাল: এই বছর বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠায়, যার সরকারি হিসাব অনুযায়ী সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জন, ওমানে ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৮ হাজার ৪২২ জন, কাতারে ৫৬ হাজার ১৪৮ জন, কুয়েতে ৩৬ হাজার ৫৪৮ জন এবং জর্ডানে ৮ হাজার ৬২৬ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।
  • ২০২৪ সাল: মোট ১০ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ জন শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৮১২ জন, কাতারে ৭৪ হাজার ৪৬৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ৪৭ হাজার ১৫৮ জন, কুয়েতে ৩৩ হাজার ১৫ জন, জর্ডানে ১৫ হাজার ৪১০ জন এবং লেবাননে ৪ হাজার ২৩০ জন কর্মী গেছেন।

প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা ও খাতসংশ্লিষ্টদের মন্তব্য

সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী শরিফুল হক জানান, তিনি দুবাইয়ে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন এবং ভালোই আয় করছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব আরব আমিরাতেও পড়েছে। ইরানের হামলার পর দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর রেস্তোরাঁটি বন্ধ রাখতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সেখানে এখনো পর্যটকের আনাগোনা নেই। ফলে এখন রেস্তোরাঁ খুললেও বিক্রি নেই বললেই চলে। এতে তাঁর আয়-রোজগারে বড় ধরনের টান পড়েছে এবং বর্তমান আয় দিয়ে রেস্তোরাঁ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি তিনি দেশে পরিবারকে টাকাও পাঠাতে পারছেন না।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সেক্রেটারি মাজহারুল ভূইয়া গতকাল বলেন, “আমাদের সৌদি আরব রুটটি এখন অনেকটা বন্ধের মুখে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কুয়েতে যেসব ভিসা হচ্ছে, সেগুলো পুরনো ভিসা, নতুন করে ভিসা হওয়া প্রায় বন্ধ। করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে মানুষ যখন একটু সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছিল, তখনই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়। ফলে আজ ফ্লাইট বাতিল তো হয়তো কাল নতুন শিডিউল। মানুষ যেতে চাইলেও বর্তমানে বিমানভাড়া অনেক বেশি। আগে যেখানে ন্যূনতম ভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা, তা এখন বেড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার ওপরে।”

পর্যটন ভিসার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “ওমান ও দুবাইয়ের ভ্রমণ ভিসা অনেক দিন ধরে বন্ধ। আর বর্তমানে সৌদি আরবে শুধু ওমরাহ ভিসা ছাড়া অন্য সব ভিসার ক্ষেত্রে স্থবিরতা চলছে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিগুলো অনিশ্চয়তার কারণে নতুন লোক নিতে চাইছে না। বিমানের জ্বালানির দাম বাড়ায় ভাড়াও বাড়ছে। এতে এজেন্সির ব্যবসা ও ট্রাভেল ট্রেডের ওপর চারদিক থেকে বড় ধাক্কা লেগেছে।”

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও সুপারিশ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, “বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এবং সবচেয়ে বড় নির্ভরতা সৌদি আরবের ওপর। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শ্রমবাজারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্প্রসারণ, ঝুঁকি কমানো বা বিকল্প বাজার তৈরির মতো কাঠামোগত উদ্যোগ যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। সরকারি আলোচনা থাকলেও শ্রম অভিবাসনের বড় অংশই এখনো প্রাইভেট এজেন্সি ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে চলছে। ফলে বড় কোনো সংকট এলে বিকল্প বাজার প্রস্তুত না থাকায় বাংলাদেশকে সরাসরি ধাক্কা খেতে হচ্ছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ও বেতন নিয়মিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।”

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, “অদক্ষ শ্রম অভিবাসন ও রেমিট্যান্সের চোরাবালি থেকে বের হওয়ার বিকল্প ভাবনার সময় এখনই। গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ কর্মী যাওয়ার পরও আমাদের রেমিট্যান্স উল্টো কমে সাড়ে তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রকৃতপক্ষে দেশ থেকে পাচার ও লুটপাট হয়ে গেছে। এছাড়া টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জের মতো প্রবাসী-প্রধান এলাকায় তীব্র কৃষি শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাদারীপুরের মতো জেলা থেকে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সাগরপথে লিবিয়া হয়ে ইতালি গিয়ে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে অথচ জেলাটি দরিদ্রই রয়ে গেছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সরকার কত লাখ কর্মী পাঠাল সেই হিসাব বন্ধ করে তারা কতটুকু দক্ষ এবং কতটুকু রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছে, সেই হিসাব করতে হবে। আমাদের সামনে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছর ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা সুবর্ণ সময় রয়েছে, এরপর আমাদের জনসংখ্যা প্রবীণ হতে শুরু করবে। তাই শিক্ষা ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের মতো নতুন পুনর্গঠন বাজারে কর্মী পাঠানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।”

দেশে ফিরে আসা কর্মীরা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ইরান ও বাহরাইন থেকে বেশ কিছু কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে চলতি বছরের এ পর্যন্ত ইরান থেকে সরকারি সহায়তায় মোট ২০১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। আর বাহরাইন থেকে ফিরেছেন ২৮২ জন কর্মী।