জুলাই গণহত্যার বিচার ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন সাবেক প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম

বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম জুলাই মাসে সংঘটিত গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি এই বিচার কেন ধীরগতিতে এগোচ্ছে এবং গত চার মাসে কেন কোনো তদন্ত রিপোর্ট দাখিল হয়নি বা নতুন কোনো বিচার শুরু হয়নি, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

শুক্রবার রাজধানীর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘রেভোল্যুশন’স ওয়াচ’ আয়োজিত ‘জুলাই থ্রু দ্য লেন্স অব লিটারেচার’ শীর্ষক এক কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিচার সম্পন্ন করার তাগিদ

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের অমানবিক যে গণহত্যা, সেটা ইন্টারন্যাশনাল লতে জেনোসাইড বলা হয়, সেটা নয়। এটা ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি। সেটার বিচার কেন স্লো হয়ে গেল? সেটার তদন্ত গত চার মাসে একটিও তদন্ত রিপোর্ট দাখিল হলো না, একটিও নতুন বিচার শুরু হলো না কেন?’ তিনি বিচার দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘আমরা কি এদের বিচারগুলো করতে চাই না? এদের প্রত্যেকটা বিচার আমাদের সম্পন্ন করতে হবে। তা না হলে যারা রাস্তায় আস্ফালন করছে, তারা কিন্তু আবারও ফিরে আসার ধৃষ্টতা দেখাবে।’

তিনি গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হওয়া রায় সবাইকে পড়ে দেখার পরামর্শ দেন এবং বলেন, এই রায়ের ওপর একটি বই লেখা উচিত। যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিটি সাক্ষ্য নিয়েও বই লেখা সম্ভব।

জুলাই জাদুঘর ও সাহিত্যকর্ম

তাজুল ইসলাম জুলাই জাদুঘর এখনো সবার জন্য খুলে না দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

কর্মশালায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালনকারী শফিকুল আলম বলেন, ‘জুলাইকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, জুলাইয়ের যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। দোসররা এখনো আছে।’ তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে সাহিত্যকর্ম কম হওয়ার কারণ হলো, এখনো একটা প্রজন্ম এই ঘটনা নিয়ে মগ্ন আছে। সাহিত্য লিখতে হলে ঘটনা থেকে দূরত্ব লাগে। তবে সামনে এই অভ্যুত্থান নিয়ে নিশ্চয়ই আরও লেখালেখি হবে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হবে। দেশের জনগণ জুলাইয়ের জনযুদ্ধকে ধারণ করায় এটি মানুষের মননে, বুদ্ধিবৃত্তিতে, সাহিত্যে অনেক শতাব্দী ধরে থাকবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাস নিয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত সাহিত্য লেখা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত চলচ্চিত্র বানানো যাবে না। এ জন্য সবার আগে জুলাই নিয়ে উপন্যাস লাগবে, তবে সেটি যাতে ফরমায়েশি না হয়।

চিত্রনাট্যকার মাবরুর রশীদ বান্নাহ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ড্রোন ওড়ানো, ডকুমেন্টারি বানানো প্রশংসার দাবিদার। তবে জুলাই নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানো বেশি জরুরি ছিল। কেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র বানানো হয়নি, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।

লেখক ও গবেষক প্রিন্স মুহাম্মাদ সজল বলেন, রাষ্ট্রপতির অপসারণ না হওয়া, জনগুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সামরিক ও বেসামরিক পদে থাকা ফ্যাসিস্টদের দোসরদের স্বপদে থেকে যাওয়া, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জায়গা থেকে সরে গিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে যাওয়া—এসব কারণে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে মানুষের আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে। এসবের ফলে ফ্যাসিস্টদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত নতুন বাংলাদেশ তৈরির বদলে ক্ষমতার রদবদলের মাধ্যমে জুলাইয়ের অর্জন সীমিত হয়ে গেছে। এ জন্য অসমাপ্ত বিপ্লবকে সমাপ্ত করার জন্য বর্তমান প্রজন্মকে কাজ করতে হবে।

কর্মশালায় কবি হাসান রোবায়েতও বক্তব্য দেন।

প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাজুল ইসলামকে। ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি মামলার রায় ইতিমধ্যে হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে এই চার মামলার রায়ে।

নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাজুল ইসলামকে। বর্তমানে ট্রাইবুনালের মামলাগুলো এগিয়ে নিচ্ছেন মো. আমিনুল ইসলাম।