প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে মানুষ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে এই সত্যটি পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি এটিও স্বীকার করা প্রয়োজন যে, সুসংগঠিত মানবসম্পদ ছাড়া কেবল মানুষের সংখ্যা দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের মূল শর্ত হলো সেই জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এই সক্ষমতা কেবল অর্থনৈতিক উৎপাদন বা শ্রমশক্তির দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও মানুষের সক্ষমতার বিকাশ ঘটা প্রয়োজন।
মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রাথমিক উপকরণ হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। শিক্ষার লক্ষ্য কেবল সনদ অর্জন নয়, বরং দক্ষতা বৃদ্ধি ও গুণগত জ্ঞানের বিস্তার হওয়া উচিত যা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা সম্ভব। একই সঙ্গে সুস্বাস্থ্য, সুপুষ্টি এবং সামাজিক যূথবদ্ধতা মানুষের সক্ষমতাকে শাণিত করে। অন্যদিকে, যখন মানুষের সক্ষমতা তৈরি হয় না, অর্জিত সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে অথবা সক্ষমতা অসমভাবে গড়ে ওঠে, তখনই জনসংখ্যা দেশের জন্য দায় হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র, পরিবার এবং ব্যক্তি—এই তিনের সমন্বিত উদ্যোগেই সক্ষমতার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাঁচটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, দক্ষ জনশক্তি তৈরির অভাবে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম আয় করেন। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বেকার থাকায় অর্জিত সক্ষমতার বড় ধরনের অপচয় ঘটছে। প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৩ লাখের কর্মসংস্থান হয়, যা উদ্বেগের বিষয়। তৃতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সনদমুখী হওয়ায় শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। চতুর্থত, মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ হলেও ৮৬ লাখ তরুণ শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের বাইরে রয়ে গেছে, যার ফলে আমরা জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ হারাচ্ছি। পঞ্চম বিষয়টি হলো, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বর্তমানে ২ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা জনসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।
রাষ্ট্রীয় ঔদাসীনতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সুযোগ-সুবিধার সংকোচন এবং রক্ষণশীল মতবাদের প্রসার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হার নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে বিদ্যমান জনসংখ্যাকে প্রকৃত জনসম্পদে রূপান্তরের কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা।

