২২ জুলাই ২০২৪: কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধে উত্তাল দেশ, ব্যাপক ধরপাকড়

২০২৪ সালের ২২ জুলাই দিনটি ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশজুড়ে এক চরম অস্থিরতার সময়। এদিন রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হয়। এই সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের প্রায় ১ হাজার ২০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখে এবং সাধারণ ছুটির মেয়াদ আরও এক দিন বৃদ্ধি করে। ১৯ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া কারফিউ এদিনও বহাল ছিল, যদিও দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তা শিথিল করা হয়েছিল।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন গণভবনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অভিযোগ করেন যে, বিএনপি-জামায়াত কোটা সংস্কার আন্দোলনের আড়ালে সরকার উৎখাতের নীল নকশা বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না।’ তার এই মন্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, আন্দোলনের শুরুর দিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ থাকলেও সরকারের দমন-পীড়ন ও কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ২১ জুলাই রাত থেকে ২২ জুলাই সকাল পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকা থেকেই ৫১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৭ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ১৬৪টি মামলা দায়ের করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, বগুড়া, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‍্যাবের পৃথক অভিযানেও কয়েক ডজন ব্যক্তি আটক হন।

আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীমকে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এছাড়া, গভীর রাতে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর ও তল্লাশির অভিযোগ ওঠে এবং দলের একাধিক শীর্ষ নেতার বাসভবনে অভিযান চালানো হয়।

একই দিনে কোটা সংস্কারসংক্রান্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষর করেন। এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি জানিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ঘোষণা করেন এবং পূর্বঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করেন। এদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। রাজধানীজুড়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‍্যাবের কড়া নিরাপত্তা ছিল, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয় এবং আকাশে হেলিকপ্টার টহল দেয়। জুলাইয়ের এই ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে গণ্য হয়, যা শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চট্টগ্রামে ৪৬ জন, নারায়ণগঞ্জে ১১০, গাজীপুরে ১৫৬, বগুড়ায় ৯৪, কুমিল্লায় ৯১, রংপুর, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, বরিশাল, জামালপুর, লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‌্যাবও পৃথক অভিযানে কয়েক ডজন ব্যক্তিকে আটক করে।