মাতারবাড়ী এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে অনিশ্চয়তা, দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট

মাতারবাড়ী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটি চার দিনেও সারানো সম্ভব হয়নি। গত মঙ্গলবার সকালে শর্ট সার্কিট থেকে টার্মিনালটিতে আগুন লাগার পর থেকেই সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। শুক্রবার ছুটির দিনেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় গ্যাস ছিল না, যার ফলে জনজীবন ও শিল্প খাতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও ধনুয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ২০০ কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন গ্যাস সরবরাহ করতে না পেরে বন্ধ রাখা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, স্বাভাবিক অবস্থায় দেশে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি থেকে ১১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাজ্য থেকে তিনজন প্রকৌশলী আনা হয়েছে, যারা বৃহস্পতিবার রাত থেকে টার্মিনালে পুড়ে যাওয়া কেবলগুলো পুনঃস্থাপনের কাজ করছেন। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তারা টার্মিনাল চালুর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি। অপারেটর কোম্পানি এক্সিলারেটরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারিগরি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা টার্মিনালটি চালু করবে না, কারণ ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় জাহাজ থেকে এলএনজি খালাস করা বিপজ্জনক হতে পারে।

গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, অনেক কারখানার মালিক শ্রমিকদের সাময়িক ছুটি দেওয়ার কথা ভাবছেন। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সংকট সামাল দিতে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ ৭৫ কোটি ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৬৮ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে, যাতে শিল্প ও সিএনজি খাতে সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, শুক্রবার রাত ১টায় সারা দেশে ৯২৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বড় কোনো বিপর্যয় আপাতত ঘটেনি। বর্তমানে গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬ হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে ৩৫০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, টার্মিনাল চালু হতে যত দেরি হবে, সংকট ততই ঘনীভূত হবে। এছাড়া টার্মিনাল সচল হলেও গ্যাস পাইপলাইন পূর্ণ হয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে রোববার থেকে সব অফিস-আদালত ও কারখানা পুরোপুরি চালু হলে গ্যাসের জন্য হাহাকার আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গত শুক্রবার রাত ১টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ৯২৪ মেগাওয়াট। এদিন দুপুর ১টায় লোডশেডিং ছিল ২৬০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশে এখন বৃষ্টি হচ্ছে। তাই বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কমেছে। ফলে বিদ্যুৎ নিয়ে হৈ চৈ হচ্ছে না। এ সময় বৃষ্টি না হলে বিদ্যুতের সরবরাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করত।

পিডিবি জানিয়েছে, এতদিন গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো ৬ হাজার মেগাওয়াট। শুক্রবার তা নেমে এসেছে ৩৫০০ মেগাওয়াটে। দুপুর ২টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৪৫৮ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ করা হয়েছে ১২ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, টার্মিনাল চালু হতে যত বেশি সময় লাগবে দেশে গ্যাস সংকট তত বেশি বাড়বে। এমনকি টার্মিনাল চালুর ২-৩ দিনেও গ্যাস সরবরাহ সিস্টেম স্বাভাবিক হবে না। কারণ পাইপলাইনের গ্যাস পূর্ণ হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তারা বলেন, শুক্রবার এবং শনিবার সরকারি বন্ধের কারণে গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কম। কিন্তু রোববার থেকে অফিস আদালত এবং সব ফ্যাক্টরি চালু হলে দেশে গ্যাসের জন্য আরও হাহাকার বাড়বে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত