প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আল্লাহর সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করুন

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে কঠিন শিলাস্তরের চ্যুতি বা স্থানান্তরের কারণে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হলেও, ইসলামে এটিকে নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সতর্ক ও সাবধান করেন, যেন তারা তওবা করে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং নিজেদের সংশোধনের পথে ফিরে আসে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি ভয় দেখানোর জন্যই নিদর্শন পাঠাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৫৯)। তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই আমি গুরুতর শাস্তির আগে লঘু শাস্তি দেব, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা সাজদা : ২১)।

ভূমিকম্প মানুষকে নিজের অপরাধের জন্য তওবা করতে, অনৈতিক আচরণ সংশোধন করতে, সার্বিক নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতে, আল্লাহকে অধিক স্মরণ করতে এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহতায়ালা মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার আজাব নিঝুম রাতে তাদের কাছে আসবে না, যখন তারা গভীর ঘুমে বিভোর হয়ে থাকবে!’ (সুরা আরাফ : ৯৭)। বান্দার অপরাধ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘যে বিপদাপদই তোমাদের ওপর আসুক, তা তোমাদের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা : ৩০)।

কেয়ামতের আগে ছোট-বড় অনেক লক্ষণ প্রকাশ পাবে, যার কিছু আলামত এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। ভূমিকম্প ও ভূমিধস কেয়ামতের অন্যতম নিদর্শন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে পর্যন্ত ইলম (জ্ঞান) তুলে না নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প না হবে, সময় সংকুচিত হয়ে না আসবে, ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) প্রকাশ না পাবে এবং খুন-খারাবি বৃদ্ধি না পাবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি না পাবে যে, তা উপচে পড়বে, ততক্ষণ কেয়ামত সংঘটিত হবে না।’ (বোখারি : ১০৩৬)। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানবজাতি, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয় কেয়ামত দিবসের ভূমিকম্প হবে এক ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, প্রত্যেক স্তন্যপায়ী মাতা তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হবে। মানুষকে তোমরা মদ্যপ অবস্থায় দেখবে, অথচ তারা মদ্যপ নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।’ (সুরা হজ : ১-২)।

পৃথিবীতে যত বিপদাপদ ও বিপর্যয় নেমে আসে, তা মূলত মানুষের পাপ ও অপরাধের ফল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের ফলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করাবেন, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম : ৪১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হবে, আমানতের মাল আত্মসাৎ করা হবে, জাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে, ধর্মবিবর্জিত শিক্ষার প্রচলন হবে, পুরুষ স্ত্রীর অনুগত হবে অথচ মায়ের অবাধ্য হবে, বন্ধুদের কাছে টানবে অথচ পিতাকে দূরে ঠেলে দেবে, মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে শোরগোল করা হবে, পাপাচারীরা গোত্রের নেতা হবে, নিকৃষ্ট লোক সমাজের কর্ণধার হবে, কোনো ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তাকে সম্মান করা হবে, গায়িকা, নর্তকী ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে, মদ পান করা হবে, এ উম্মতের শেষ জামানার লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী মনীষীদের অভিসম্পাত করবে, তখন তোমরা অগ্নিবায়ু, ভূমিধস, ভূমিকম্প, চেহারা বিকৃতি ও পাথর বর্ষণের মতো শাস্তির এবং আরও লক্ষণের অপেক্ষা করবে, যা একের পর এক আসতে থাকবে, যেমন পুরোনো পুঁতির মালা ছিঁড়ে গেলে তার পুঁতিগুলো একে একে ঝরে পড়ে।’ (তিরমিজি : ২২১১)।

ভূমিকম্পের সময় ইসলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও করণীয় নির্দেশ করেছে। প্রথমত, নামাজ আদায় করা। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে নামাজ আদায়ের সুন্নাহ প্রমাণিত। ভূমিকম্পও একই প্রকৃতির বিপদ ও ভয়াবহ বিপর্যয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ভূমিকম্পের সময় বসরায় নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন (সুনানে বাইহাকি : ৩/৩৪৩)। ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, ইসহাক ও আবু সাওরের মাজহাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পের সময় নামাজ আদায়ের পদ্ধতি চন্দ্র-সূর্যগ্রহণের মতোই। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘তীব্র ঝড়, প্রবল বাতাস, ভূমিকম্প, উল্কাপাতের সময় একাকী নামাজ পড়া উত্তম।’ (আল-মুগনি : ৩/৩৩২-৩৩৩)।

দ্বিতীয়ত, অনুশোচনা ও তওবা করা। ভূমিকম্পের সময় পাপ এবং অবাধ্যতার জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করা মুস্তাহাব। ভূমিকম্প আল্লাহর ক্ষমতার প্রকাশ ও সতর্কবার্তা। এর পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য হলো, বান্দারা তাঁর দিকে ফিরে আসবে এবং অনুতপ্ত হয়ে পাপ ছেড়ে দেবে। কুফায় এক ভূমিকম্পের সময় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘হে লোকসকল! তোমাদের রব তোমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির দিকে ফেরাতে চান, তোমরা তাঁর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করো।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৩/৪৮)।

তৃতীয়ত, দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। দোয়ার অর্থ আল্লাহকে ডাকা। ইমাম কুস্তালানি (রহ.) বলেন, ‘বজ্রপাত, প্রবল বাতাস এবং ভূমিধসের মতো ভূমিকম্পের সময় দোয়া ও ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা বাঞ্ছনীয়।’ (ইরশাদুস সারি ফি শরহি সহিহিল বোখারি : ২/২৫৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এগুলো আল্লাহর নিদর্শন, যা তিনি পাঠান কারো মৃত্যু বা জন্মের জন্য নয়; বরং আল্লাহ তা দ্বারা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেন। কাজেই যখন তোমরা এমন কিছু দেখতে পাবে, তখন ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় আল্লাহর জিকির (স্মরণ), দোয়া ও ইস্তিগফারের দিকে অগ্রসর হবে।’ (বোখারি : ১০০০)। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এই হাদিস থেকে যেকোনো বিপদে জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার মুস্তাহাব হওয়ার প্রমাণ গ্রহণ করেছেন (ফাতহুল বারি ফি শরহি সহিহিল বোখারি : ২/৬৩৫)।

চতুর্থত, তাকবির দেওয়া ও জিকির করা। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসব নিদর্শন বা বিপদের সময় তাকবির দেওয়ার কথা বলা হয়েছে (বোখারি : ১০৪৪)। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে জিকির করার কথা বলা হয়েছে (মুসলিম : ৯০৭)। বিপদের সময় সংক্ষিপ্ত দোয়া বারবার পড়া মুস্তাহাব, যেমন- ‘ইয়া হাইয়ু! ইয়া কাইয়ুম! বি রহমাতিকা আস্তাগিস’ (তিরমিজি : ৩৫২২)। অথবা ‘আল্লাহ, আল্লাহ, রব্বি, লা উশরিকা বিহি শাইআ’ (সুনানে আবি দাউদ : ১৫২৫)। তবে ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে সুন্নাহসম্মত দোয়া হলো, ‘আউযু বি ওয়াজহিকা’ পড়া (বোখারি : ৬৮১৫), যার অর্থ- ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার পবিত্র চেহারার আশ্রয় প্রার্থনা করছি’।

পঞ্চমত, সদকা করা। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থাকা অপরিহার্য। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) তার গভর্নরদের সিরিয়ার ভূমিকম্পের ক্ষতিপূরণের জন্য সদকা (দান) করার আদেশ দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তাতে তিনি সাধারণ জনগণকে ভূমিকম্পের সময় দান-সদকা করতে উৎসাহিত করেছেন (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৮৪১৪)। তাই ভূমিকম্পের পর সদকা করা মুস্তাহাব।

ষষ্ঠত, মানবতার মুক্তি। ভূমিকম্প মানবতার জন্য এক ভয়াবহ বিপদ, যা সূর্যগ্রহণের চেয়েও ভীতিকর। আসমা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সূর্যগ্রহণের সময় দাস মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন (বোখারি : ৯৯৬)। ভূমিকম্পের সকল বিধানে আলেমগণ চন্দ্র-সূর্যগ্রহণের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া জাতীয় নিষ্কৃতি। ফলে এর বিনিময় হলো জীবন রক্ষার বিনিময়। অতএব, ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে মানবতার প্রতি আরোপিত বাধ্যবাধকতার পরিস্থিতি সহজতর করা ইসলামের শিক্ষা। দাস মুক্তির স্থলে বৈদেশিক ঋণমুক্তি, বন্দী বিনিময়, কারামুক্তি কিংবা ঋণমুক্তি ইত্যাদি মানবতার মুক্তির সমতুল্য।

সপ্তমত, সতর্কতা ও জরুরি বার্তা। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে মদিনায় এক ভূমিকম্প হয়। এতে বিছানাপত্র সব এলোমেলো হয়ে যায়। অথচ আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) নামাজরত ছিলেন এবং কিছুই টের পাননি। এরপর ওমর (রা.) জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ২/৪৭৩, সুনানে বাইহাকি : ৩/৩৪২)। ভূমিকম্প সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে ভাষণ দেওয়া মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়কালে মদিনায় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। তবে তিনি চন্দ্র-সূর্যগ্রহণের সময় দ্রুত মসজিদে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন (বোখারি : ১০৪৭)।