বাংলাদেশে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বাণিজ্য এবং অনলাইন জুয়ার মতো অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন ‘নেক্সট ভেঞ্চার’ ও ‘ফান্ডেড নেক্সট’ নামক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ জায়েদ, যিনি ‘ডিজিটাল মাফিয়া’ হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। তার উত্থান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হলেও, রহস্যজনক কারণে এখনো তিনি নির্বিঘ্নে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে জানা গেছে।
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার (ফরেক্স) ট্রেডিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং লাইসেন্সবিহীন ডিজিটাল অর্থ (ভার্চুয়াল মানি) তৈরি, লেনদেন ও অনলাইন ক্যাসিনো জুয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু সৈয়দ আব্দুল্লাহ জায়েদ আইনকে উপেক্ষা করে বিদেশে কালো টাকা পাচারসহ এসব অবৈধ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি দেশে ও বিদেশে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অর্থ পাচার ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
সূত্রমতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই তিনি দেশের বাইরে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত। কারাবন্দী সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বেশ কয়েকজন ব্যক্তির হাজার কোটি টাকা এই জায়েদের মাধ্যমেই পাচার হয়েছে। এছাড়া, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলাও রয়েছে। টাঙ্গাইলের আশরাফ আলী নামের এক ব্যক্তি ঢাকার বিজ্ঞ মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে আব্দুল্লাহ জায়েদ আওয়ামী লীগ আমল থেকে এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বিটকয়েন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলত এর মাধ্যমেই তিনি দেশ থেকে অর্থ পাচার করছেন। অর্থ পাচারের জন্য মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার পাশাপাশি তিনি সংশ্লিষ্ট অনেককে তার এই অবৈধ ব্যবসায় যুক্ত হতে বাধ্য করেন। তার এই অবৈধ ব্যবসা এখনো সচল রয়েছে, যার প্রমাণ হিসেবে রাজধানীর বাড্ডায় তার অফিস চালু থাকা এবং তার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলো সক্রিয় থাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সেসময় নির্বিঘ্নে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া জায়েদ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন। এখনো তিনি প্রকাশ্যে সব অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং প্রশাসন রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছে।
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও দমনের চেষ্টা
জায়েদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। হত্যা মামলার আসামি হয়েও তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এখনো তিনি ও তার সিন্ডিকেট নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বাণিজ্য করে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারে ব্যস্ত।
গত বছরের ১৮ জুন ‘নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বাণিজ্যে আঙুল ফুলে কলাগাছ জায়েদ’ শিরোনামে একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে জায়েদ প্রকাশিত তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে ব্যর্থ হয়ে সংবাদটি ওই পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে সরিয়ে ফেলতে নানামুখী অপচেষ্টা চালান। এজন্য তিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকেও নানাভাবে অপব্যবহার করেন। এছাড়া, আর কোনো রিপোর্ট না করার জন্য তিনি প্রতিবেদককে ডেকে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের প্রলোভন দেখান।
প্রতিষ্ঠানের বিস্তার ও অবৈধ বিনিয়োগ
গোয়েন্দা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জায়েদ ‘নেক্সট ভেঞ্চার’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিকভাবে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশে ব্যবসা শুরু করলেও, একপর্যায়ে তিনি ফরেক্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এই উদ্দেশ্যে ২০২২ সালে তিনি ‘ফান্ডেড নেক্সট’ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমি মার্টিনেজকে ঢাকায় এনে জায়েদ তার প্রভাব জাহির করেন। ‘ফান্ডেড নেক্সট’-এর অফিস ও কার্যক্রম সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ডস, সাইপ্রাস, হংকং ও শ্রীলঙ্কায় বিস্তৃত রয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য জায়েদ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো অনুমতি নেননি। অথচ বাংলাদেশসহ শতাধিক দেশে অবৈধ ফরেক্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসা করে তিনি শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তিনি বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন এবং দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়েছেন। তার বিলাসিতা যেকোনো ধনকুবেরের জীবনযাপনকেও হার মানাবে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্ষমতা লাভ
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জায়েদ পলকসহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার নির্বাচনে স্পন্সর করেন। কালোটাকার দাপটে তিনি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বেসিসেও (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) পরিচালক পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৪ সালের ৮ মে অনুষ্ঠিত বেসিস নির্বাচনে বিপুল অর্থের বিনিময়ে তিনি ভোট কিনেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও মানি লন্ডারিংয়ের হোতা
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জায়েদ বাংলাদেশের ক্রিপ্টোকারেন্সি বেচা-কেনাসহ মানি লন্ডারিং ও অনলাইন প্রতারণার অন্যতম হোতা। অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার জন্য নানা ধরনের ছলচাতুরি, কূটকৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। জায়েদ দেশের ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনা-বেচার মাস্টারমাইন্ড। গত কয়েক বছর ধরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি অনেককে প্রতারিত করেছেন।
ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। দেশের আইন অনুযায়ী, বিটকয়েনের মতো যেকোনো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন অবৈধ। এই ধরনের লেনদেন স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট এবং দুর্নীতিবিরোধী আইনের লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন অর্থ পাচার হিসেবেও বিবেচিত হবে। অভিযোগ রয়েছে, জায়েদের ‘ফান্ডেড নেক্সট’ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ আব্দুল্লাহ জায়েদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
