ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নজিরবিহীন পতনের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা বিদেশে পালিয়ে যান অথবা দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে চলে যান। এর ফলে দলটি রাজপথে আর সক্রিয় থাকতে পারেনি। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আত্মগোপনে থাকা কিছু নেতাকর্মী হাতেগোনা কয়েকটি ছোটখাটো ঝটিকা মিছিল বের করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই পতিত দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে তাদের তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করছে। সূত্র অনুযায়ী, আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন হঠাৎ করে একত্রিত হয়ে মুখে কালো কাপড় বেঁধে ঝটিকা মিছিল বের করে দ্রুত মিলিয়ে যায়। এরপর এসব মিছিল ও মানববন্ধনের ছবি এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে রাজনীতিতে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝে ঢাকার উত্তরা ও মহাখালীর মতো বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাজপথে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের মতে, শীর্ষ নেতারা পলাতক থাকলেও হঠাৎ করে এমন ঝটিকা মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপরতা বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য হলো জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা অথবা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর, যা ভারতকে এড়িয়ে হচ্ছে, তা প্রতিবেশী দেশটি ভালোভাবে গ্রহণ করছে না। এ কারণে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে এবং বিদেশে অবস্থানরত পলাতক নেতাকর্মীদের যোগসাজশ ও পরামর্শে বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, পতিত দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের তাদের পলাতক হাইকমান্ড রাজপথে তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার ফলস্বরূপ রাজপথে এই অস্বাভাবিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রস্তুতি
নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, রাজনৈতিক কার্যক্রম ও প্রকাশ্যে শোডাউন নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো বিভিন্ন স্থানে ‘ঝটিকা মিছিল’ ও অন্যান্য তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে আগামী ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পতিত দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা হঠাৎ করে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
সূত্র আরও জানায়, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তৃণমূলের জন্য একটি বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে আসার বিষয়ে শেখ হাসিনা এখন অনেকটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি তার এই মনোভাব ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। পতিত আওয়ামী লীগ প্রধান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি ভারত সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা সম্পন্ন করেছেন এবং দেশে ফেরার বিষয়ে তার ইচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ সম্পর্কে দিল্লিকে অবহিত করেছেন।
দলীয় প্রধানের পক্ষ থেকে তৃণমূলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার জন্য এই ধরনের বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। তৃণমূলের কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করে বলেছেন যে, নেত্রী বীরের বেশে দেশে ফিরবেন। হযরত শাহজালাল (রহ) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে তিনি দেশে ফিরবেন এবং তাকে স্বাগত জানাতে লাখো নেতাকর্মী সেখানে জড়ো হবেন। তবে কখন বা কিভাবে তিনি দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কেউই নিশ্চিত নন। তাদের বলা হয়েছে, নির্দেশ পেলেই তারা রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। হাইকমান্ড থেকে তৃণমূলের প্রতি পাঠানো বার্তায় বলা হয়েছে, “এবারের সংগ্রাম শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম।” এই লক্ষ্য নিয়ে নেতাকর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
দলের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আপা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। তিনি যেভাবে ভারতে গিয়েছিলেন, সেভাবেই বীরদর্পে জনগণের মাঝে ফিরে আসবেন। তার ফিরে আসা উপলক্ষে বিপুল জনসমাগম করার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ কিছুদিন ধরে পতিত দলটির অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের অ্যাকাউন্ট থেকে এ ধরনের বক্তব্য সম্বলিত ফটোকার্ড তৈরি করে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে, ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রেফতার এড়াতে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সম্ভাব্য নাশকতারোধ এবং বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ড. আবদুল লতিফ মাসুমের বিশ্লেষণ
বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কখনোই চাইবে না যে দেশ ভালোভাবে চলুক। এ কারণেই আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝে তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দেয় এবং ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সম্প্রতি তাদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তিনি ভালো লক্ষণ বলে মনে করছেন না।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. মাসুম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে ভারত ভালোভাবে নেবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। সরকারকে ভারত এড়িয়ে চীনের দিকে ঝুঁকতে দেখা যাচ্ছে এবং চীনের সাথে তিস্তাসহ কয়েকটি বড় চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। এ কারণে ভারতও বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য কাজ করতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এ দেশে ভারতের অনেক এজেন্ট রয়েছে যারা সর্বাত্মকভাবে ভারতকে সহযোগিতা করে থাকে।
