রাজধানীর তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়িতে অবস্থিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের সম্পদ বিভাগে টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গণপূর্তের সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিউল ইসলাম। অনুসন্ধানে জানা যায়, কার্যালয়টিতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে, যারা নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে ত্রুটিপূর্ণ প্রাক্কলন তৈরি, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং যোগ্য ঠিকাদারদের দরপত্র থেকে বাদ দেওয়ার মতো নানা অপকর্মে লিপ্ত।
অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তেজগাঁও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ‘মা এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী ঠিকাদার জামাল হোসেনের সাথে নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলামের ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র ছিল। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতে নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তার কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী ও স্টাফ অফিসার শরিফুল ইসলাম মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও এই কার্যালয়ে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। পাবনা জেলায় গ্রামের বাড়ি হওয়ার সুবাদে বিগত সময়ে রাষ্ট্রপতির প্রভাব খাটিয়ে দাপট দেখানো নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম বর্তমানে ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপি-পন্থী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। এমনকি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার নাম ভাঙিয়ে তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ ঠিকাদারদের মতে, এই রাজনৈতিক পরিচয় কেবলই তার দুর্নীতি ও অনৈতিক বাণিজ্য আড়াল করার ঢাল। বিপুল এই অবৈধ আয়ের মাধ্যমে তিনি রাজধানী ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় কোটি কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করে পরিবারসহ বসবাস করছেন।
গণপূর্ত সম্পদ বিভাগের অন্দরমহলে এই সিন্ডিকেটের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করছেন সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুশান্ত দত্ত। এই ত্রিমুখী চক্রের কাছে সাধারণ ও তালিকাভুক্ত ঠিকাদাররা সম্পূর্ণ জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এলেনবাড়ি সম্পদ বিভাগের অধীনে যখনই কোনো কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়, তখনই ঠিকাদার জামাল হোসেনের প্রতিষ্ঠানের সাথে গোপন আঁতাত করে এমন কিছু বিশেষ ও ত্রুটিপূর্ণ শর্ত যুক্ত করে প্রাক্কলন বা ইস্টিমেট তৈরি করা হয়, যাতে সাধারণ কোনো ঠিকাদার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারেন। এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শর্তের বেড়াজালে পড়ে প্রতিবারই সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়ছেন, যা তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়েরকৃত এক অভিযোগ থেকে জানা গেছে, সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে সরকারের ২০২৪-২৫ এবং চলমান ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বিভিন্ন প্রকল্পের বাজেট থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বাসভবন ও ভিআইপি কোয়ার্টার মেরামত, সংস্কার ও আধুনিকায়নের নামে এসব বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান কাজ হয়নি। উল্টো ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ অর্থ উত্তোলনপূর্বক তা সিন্ডিকেটের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের চলমান বাজেট থেকে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের নাম করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
চলতি মাসে দুটি বড় টেন্ডার নিয়েও ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ চরম আকারে পৌঁছেছে। বঞ্চিত ঠিকাদারদের দাবি, সুইমিংপুলের মেরামত ও আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ সংক্রান্ত এই টেন্ডারগুলোতে প্রাক-যোগ্যতার শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্য তৈরি। এর ফলে প্রায় ২৫ জন যোগ্য ও নিয়মিত ঠিকাদার দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাদ পড়েছেন। গত ৪ মে প্রকাশিত সুইমিংপুলের কাজ এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন ভবন ১ ও ২ এর সংস্কার কাজের নামে প্রায় ৬০ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ সরাসরি গণপূর্তের এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ১ নং ভবনে বসবাসরত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত দুই বছরে তাদের এই বহুতল ভবনে কোনো ধরনের সংস্কার, রং বা মেরামতের কাজ করা হয়নি, অথচ নথিপত্রে এই কাজের বিপরীতে সম্পূর্ণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গত ১২ মে প্রকাশিত আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের দরপত্র প্রক্রিয়াটিও সম্পূর্ণভাবে পূর্বনির্ধারিত একটি এজেন্সির অনুকূলে দেওয়ার জন্য সিন্ডিকেট সব ধরনের ব্যাকডোর ডিল সম্পন্ন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রহস্যজনক নীরবতা সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতের এমন নজিরবিহীন অনিয়মের বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পিপিআর বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস অনুসরণের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও গণপূর্তের এই শাখায় তা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে পুঁজি করে সরকারি কর্মকর্তারা যখনই তাদের ভোল পাল্টে কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি সচল রাখেন তখন তা সুশাসনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
উত্থাপিত সামগ্রিক দুর্নীতি, টেন্ডার জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে কোনো ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম বা নির্দিষ্ট কোনো সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। যদি কোনো কর্মকর্তা দরপত্রে কারচুপি করে থাকেন তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল বা কোনো নেতার নাম ব্যবহার করে পার পাওয়ার দিন শেষ। এলেনবাড়ি সম্পদ বিভাগের ফাইলপত্র ও টেন্ডার প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করতে দ্রুত একটি তদন্ত দল পাঠানো হবে এবং দুর্নীতি প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এদিকে সকল অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে গণপূর্ত সম্পদ বিভাগের অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি। এমনকি তার কার্যালয়ে গিয়েও তার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয়নি।

