রাজশাহীতে হিমাগার ভাড়া কমানোর দাবিতে আলু বেচাকেনা বন্ধ

রাজশাহীতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানোর দাবিতে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা আলু বেচাকেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভাড়া পুনর্র্নিধারণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।

এই কর্মসূচির প্রথম দিনে জেলার বিভিন্ন হিমাগারে এক প্রকার অচলাবস্থা দেখা গেছে। আন্দোলনকারী চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিমাগারের প্রকৃত খরচ বিবেচনা করে একটি যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা উচিত। তাঁদের মতে, বর্তমান ভাড়া না কমালে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় আরও বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত আলুচাষি, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, হিমাগার মালিকরা দাবি করছেন যে বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার সরকার কোল্ড স্টোরেজে সরেজমিনে দেখা যায়, হিমাগার থেকে আলু বের করার কোনো তৎপরতা নেই। একই চিত্র দেখা গেছে পাশের উত্তরা কোল্ড স্টোরেজেও। সাধারণত এসব হিমাগারের সামনে আলু কেনাবেচা, লোড-আনলোড ও পরিবহনের ব্যস্ততা থাকলেও আন্দোলনের কারণে সকাল থেকে সেখানে স্থবির পরিবেশ বিরাজ করছে। রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি আলুচাষিদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আগের দিন এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, হিমাগারের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আলু বেচাকেনা বন্ধ থাকবে।

রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ এই প্রসঙ্গে বলেন, এক বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণে মালিকপক্ষের সর্বোচ্চ খরচ হয় ১০০ টাকা, অথচ চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪৭৫ টাকা, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, "এর আগেও হিমাগারের ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল। তখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে সুশীল সমাজ, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতারা আমাদের শান্ত থাকতে অনুরোধ করেছিলেন এবং আশ্বাস দিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক সরকার এলে বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।" তিনি জানান, গত ১৯ এপ্রিল তাঁরা বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে তিন থেকে চারবার বৈঠকও করেছেন। তবে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় সংগঠনের বিভিন্ন ইউনিট হিমাগার থেকে আলু বেচাকেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আহাদ আলী শাহ আরও বলেন, "রাজশাহী জেলায় মোট ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। যদি প্রতিটি হিমাগার থেকে প্রতিদিন এক হাজার বস্তা আলু বের হয়, তবে দিনে ৩৬ হাজার বস্তা আলু বাজারে সরবরাহ হওয়ার কথা। কিন্তু এই আন্দোলনের কারণে সেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ভাড়া পুনর্র্নিধারণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন থেকে সরে আসব না।"

আলুচাষি হারুন জানান, স্টোর ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে তাঁরা সকাল থেকেই বিভিন্ন হিমাগারে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের একমাত্র দাবি হলো, অবিলম্বে হিমাগারের ভাড়া কমাতে হবে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ভাড়া পুনর্র্নিধারণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কোনো ধরনের আলু বেচাকেনায় অংশ নেবেন না। কৃষক হারুন আরও যোগ করেন, "স্টোর ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। আমরা যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি এবং এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।"

রাজশাহীর আসমা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য খন্দকার আউলিয়া রাজিব ওয়াহিদ এই প্রসঙ্গে বলেন, "গত বছরও ভাড়া বৃদ্ধি পেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। তখন সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তাঁদের অনেক ছাড় দিয়ে ভাড়া পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছিল। এখন তাঁরা আবারও ভাড়া কমানোর দাবি করছেন এবং এ কারণেই আলু বের করছেন না। তবে বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া যৌক্তিকভাবেই বাড়ানো হয়েছিল।"

এই আন্দোলনের কারণে জেলার আলু বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন না করা হলে বাজারে আলুর সরবরাহ কমে যেতে পারে। এর ফলে পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই আলুর দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে, রাজশাহী জেলা মার্কেটিং অফিসার সানোয়ার হোসেন বলেন, "একটি ব্যবসায়ী সমিতি এই আন্দোলন পরিচালনা করছে। তারা সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত মূল্যে আলু রাখতে রাজি নয়, বরং কম ভাড়া দিতে চায়। এই দাবি নিয়ে তারা আমার কাছে এসেছিল। আমি তাদের বুঝিয়ে বলেছি যে, সরকার এখনো এই মৌসুমের জন্য আলুর মূল্য নির্ধারণ করেনি। তাই এ বিষয়ে আমার কিছু বলার সুযোগ নেই।" তিনি আরও যোগ করেন, আলুর দাম নির্ধারিত থাকলে সমন্বয়ের চেষ্টা করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাজার অর্থনীতিতে কে আলু বেচাকেনা করবে বা করবে না, তা প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত