শাহজালাল বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বিমান চলাচল: ভিটিএস বাস্তবায়নে অনীহা
দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী শত শত যানবাহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার আওতার বাইরে রয়েছে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে এবং এপ্রোন এলাকায় ব্যবহৃত যানবাহনে বাধ্যতামূলক ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও অধিকাংশ এয়ারলাইন্স ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তা কার্যকর করেনি। এই পরিস্থিতিতে বিমান চলাচল ও যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বেবিচকের উদ্বেগ ও নির্দেশনার অমান্য
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবহৃত যানবাহনে ট্র্যাকার স্থাপনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দেয়নি। এর ফলস্বরূপ, এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী যানবাহনের অবস্থান, গতি এবং গতিপথ কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মো. নূর-ই-আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোতে বহু বছর ধরেই ভেহিকেল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। শাহজালালে এটি পুরোপুরি চালু হলে এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী প্রতিটি অনুমোদিত যানবাহনকে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। কোনো যানবাহন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের সক্ষমতাও পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা যাবে।”
নতুন নির্দেশনা ও পূর্বের সময়সীমা
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যানবাহন ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইন্স, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান, কার্গো অপারেটর এবং ক্যাটারিং সেবা প্রতিষ্ঠানকে তাদের ব্যবহৃত যানবাহনে ভিটিএস স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে। চিঠিতে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে ট্র্যাকার স্থাপন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে ভবিষ্যতে এয়ারসাইড এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা, বিঘ্ন বা নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সব যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন সম্পন্ন করার নির্দেশ ছিল। তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি।
ভিটিএস-এর সুবিধা ও অতীতের দুর্ঘটনা
বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভিটিএস চালু হলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রতিটি যানবাহনের অবস্থান ও চলাচল সরাসরি দেখা যাবে। কোনো গাড়ি নির্ধারিত রুট থেকে বিচ্যুত হলে বা রানওয়ের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রবেশ করলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
অতীতের কয়েকটি ঘটনা এই ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে:
- গত বছরের নভেম্বরে শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে একটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছিল।
- এর আগে ২০২২ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হ্যাঙ্গারে দুটি উড়োজাহাজের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
- একই বছরে একটি ট্রলি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবহৃত গ্রাউন্ড অপারেশন এলাকায় থাকা আরেকটি উড়োজাহাজকে ধাক্কা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও এপ্রোনের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন নজরদারি এখন অপরিহার্য। বিমান চলাচল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাউন্ড সাপোর্ট যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দ্বিমুখী বক্তব্য
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, সরকার-টু-সরকার প্রকল্পের আওতায় শাহজালাল বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এ-এসএমজিসিএস) এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৮০টি ভেহিকেল ট্র্যাকার সংগ্রহ করা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বাড়ানো সম্ভব।
এদিকে, বিমান বাংলাদেশের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম দাবি করেছেন, তাদের যানবাহনে অনেক আগেই এই ট্র্যাকিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে বেবিচকের দাবি, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এখনো তাদের কাছে জমা পড়েনি। অন্যদিকে, কামরুল ইসলাম (যার পরিচয় স্পষ্ট নয়) বলেছেন, ভিটিএস স্থাপনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অব্যাহত নিরাপত্তা ঝুঁকি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হলেও যদি সব এয়ারলাইন্স ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তাদের যানবাহনকে সেই ব্যবস্থার আওতায় না আনে, তাহলে নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকেই যাবে। আর সেই ঝুঁকির মধ্যেই প্রতিদিন রানওয়েতে চলবে শত শত যানবাহন, আকাশে উড়বে হাজারো যাত্রীবাহী বিমান।

