দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করতে আগামী অর্থবছরে মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ২৮ শতাংশ থেকে ৩৪.৫ শতাংশে উন্নীত করার এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগ ১৩ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতের দুর্বল বিনিয়োগ প্রবণতার কারণে এই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট বিনিয়োগের হার জিডিপির ৩০ শতাংশের নিচেই স্থির রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের চড়া সুদহার, বৈদেশিক বিনিয়োগে ধীরগতি এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণকে সীমিত করে রেখেছে। ফলস্বরূপ, অর্থনীতির সম্ভাবনার তুলনায় বিনিয়োগ পিছিয়ে পড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় নিম্নমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও অর্থায়নের ঘাটতি একসঙ্গে চলতে থাকলে উচ্চ বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য ইতিবাচক হলেও এটি বাস্তবায়নের জন্য আস্থা পুনর্গঠন জরুরি। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর না করলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।”
গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে মোট বিনিয়োগের হার কার্যত স্থবির। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিনিয়োগ ছিল ৩১.৩১ শতাংশ, ২০২১ সালে ৩১.০২ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩২.০৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৩০.৯৫ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৩০.৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ, দীর্ঘ সময় ধরেই বিনিয়োগ ৩০-৩২ শতাংশের মধ্যে আটকে রয়েছে।
এই বাস্তবতায় এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগকে ৩৪.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া অর্থনীতিবিদদের মতে অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্য। তাদের অভিমত, শুধু নীতি ঘোষণা নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবেশে বড় ধরনের কাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
বিনিয়োগ স্থবিরতার মূল কারণ
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ স্থবিরতার পেছনে কয়েকটি মূল কাঠামোগত দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করছে। উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের চাপ নতুন বিনিয়োগ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও ডলার বাজারের অস্থিরতা উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও অবকাঠামোগত ঘাটতি, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করছে। সব মিলিয়ে অর্থায়ন, জ্বালানি ও নীতি—এই তিনটি চাপ একসঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশকে সীমিত করে রেখেছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও পরামর্শ
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, আস্থার ঘাটতি কাটানো ছাড়া নতুন বিনিয়োগে গতি আনা সম্ভব নয়। উচ্চ সুদহার ও অনিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহ নতুন প্রকল্প গ্রহণে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অভাব এবং নীতিগত অস্থিরতা শিল্প খাতে বড় চাপ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, “অনেক কারখানা এরই মধ্যে জ্বালানিসংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে টেক্সটাইল খাতে নতুন বিনিয়োগ থেমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমছে।”
অন্যদিকে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ মনে করেন, বিনিয়োগ টানতে হলে পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল ব্যাবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, নীতিগত ধারাবাহিকতা, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা ছাড়া উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, উচ্চ সুদহার এবং ঋণ বিতরণে ধীরগতি বিনিয়োগ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি কাস্টমস ও কর প্রশাসনে ডিজিটাইজেশন এবং একক উইন্ডো সেবা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হবে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও সমাধান
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান দুর্বলতা বিনিয়োগ সংকটকে আরও গভীর করছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, তারল্য সংকট এবং ঋণ অনুমোদনে ধীরগতির কারণে উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর, যারা সবচেয়ে বেশি অর্থায়ননির্ভর।
ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না, আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার ছাড়া এই আস্থার সংকট কাটানো কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে কিছু লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদনমুখী খাতে কর ছাড়, দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদের অর্থায়ন সুবিধা, এসএমই খাতে বিশেষ তহবিল সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে ডিউটি ড্রব্যাক সহজীকরণ। একই সঙ্গে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে উচ্চ বিনিয়োগ লক্ষ্য অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা কাটিয়ে না উঠলে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠবে—এমনটাই মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
