উদাসীনতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকিতে বরিশাল জাদুঘর

বরিশালের ঐতিহ্যবাহী বিভাগীয় জাদুঘরটি কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দু শতাধিক বছরের পুরনো এই ভবনটি সাম্প্রতিক এক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পশ্চিম অংশের কিছু এলাকার ছাদের ইস্পাতের ভিমসহ ইট-সুরকির কলামগুলো কিছুটা দেবে গেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কিছু ভিম সরে গেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

ভবনটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সরেজমিন প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুয়েট-এর বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে একটি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি প্রাথমিক তদন্ত শেষে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কমিটি আরও সময় চেয়েছে এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার মতামত দিয়েছে।

জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘসূত্রিতা

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সরকার বরিশাল পুরাতন কালেক্টরেট ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে। একই বছর ৪ এপ্রিল তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমান অধিদপ্তরের রাজস্ব তহবিল থেকে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটির সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজের উদ্বোধন করেন। বরিশালের সিটি মেয়র মুজিবুর রহমান সারোয়ারের সভাপতিত্বে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও উপস্থিত ছিলেন।

তবে, তৎকালীন ৪-দলীয় জোট সরকার বিদায়ের পর দু বছরের এই প্রকল্পটি শেষ করতে প্রায় এক যুগ সময় লেগে যায়। অবশেষে ২০১৫ সালের ৮ জুন তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

প্রশাসনিক জটিলতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

অত্যন্ত আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, বরিশাল প্রশাসনিক বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩৩ বছর পরেও এ অঞ্চলের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ খুলনাতেই রয়ে গেছে। এর ফলস্বরূপ, বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরসহ এ অঞ্চলের বিশাল প্রত্নসম্পদ এবং বিভাগীয় জাদুঘরটির দেখাশোনার দায়িত্ব খুলনা থেকে পরিচালিত হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল পুরাতন কালেক্টরেট ভবনটি নিম্ন গাঙ্গেয় অববাহিকায় নির্মিত ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম প্রশাসনিক ভবন হিসেবে বিবেচিত। ১৮০৩ সালে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ থেকে জেলা সদর বরিশালে স্থানান্তরের পর থেকে ১৮২১ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এই পুরাতন কালেক্টরেট ভবনটি নির্মিত হয়।

দ্বিতল এই কালেক্টরেট ভবনটি পাশ্চাত্য ও স্থানীয় ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্য রীতির অনুকরণে নির্মিত। আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত এই ভবনটির দৈর্ঘ্য ৯৪ মিটার এবং প্রস্থ ২১ মিটার। উঁচু খিলানযুক্ত এই ভবনটির নিচতলায় ১৪টি এবং দোতলায় ৯টি কক্ষ রয়েছে। উভয় তলারই দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর পাশে টানা বারান্দা বিদ্যমান। ভবনটির নিচতলার বারান্দায় একাধিক সিন্দুক দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে সে সময়ের রাজস্ব আয়ের অর্থসহ সরকারি বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণ করা হতো বলে ধারণা করা হয়।

ভবনটির নিচতলার দুটি কক্ষে লোহার তৈরি তাক রয়েছে, যা সম্ভবত রেকর্ড রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। নিচতলা থেকে দোতলায় ওঠার জন্য কাঠের দুটি সিঁড়ি ছাড়াও দোতলার উত্তর ও দক্ষিণ পাশের টানা বারান্দায় পাশ্চাত্য তুস্কান রীতির জোড়া স্তম্ভ রয়েছে। এই স্তম্ভগুলোর উপরের অংশ খড়খড়ি বিশিষ্ট প্যানেল এবং নিচের অংশ অলংকৃত লোহার রেলিং দিয়ে একটি অপরটির সাথে সংযুক্ত। এমনকি পর্যাপ্ত আলো সরবরাহের জন্য এই ভবনটির ছাদে একাধিক স্কাই লাইট রয়েছে। পাতলা ইট, টালি, লোহা এবং কাঠের বর্গা ও চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত এই ভবনটির প্রতিটি কক্ষে একাধিক দরজা ও জানালা রয়েছে।

তবে, এই ভবনটির পাশেই তৎকালীন পাকিস্তান আমলে জেলা প্রশাসনের জন্য আরেকটি আধুনিক স্থাপত্যের দোতলা ভবন নির্মিত হলেও সেটি এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি দেওয়া হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি।

অপ্রদর্শিত প্রত্নসম্পদ ও মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন

বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের দোতলায় একাধিক গ্যালারিতে প্রায় দেড় হাজার প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ সম্ভব হলেও এখনো বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো নিদর্শন এখানে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

এমনকি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকার গঠনেরও আগে বরিশালে যুদ্ধের প্রথম সচিবালয়সহ প্রথম সামরিক সচিবালয় স্থাপিত হলেও তার কোনো নিদর্শন এই বিভাগীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়নি।

জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

এসব কিছুর পাশাপাশি, ওয়াকিবহাল মহল অবিলম্বে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর ভবনটি সংরক্ষণে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন, যেটি নিজেই একটি পুরাকীর্তি হিসেবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একইসাথে, অবিলম্বে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভাগীয় অফিসটি চালুর দাবি জানানো হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে বরিশালের জেলা প্রশাসক খায়রুল কবির সুমন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বলেও জানা গেছে।

এসব বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান জানিয়েছেন যে, ভবনটির সংস্কার ও যথাযথ মানে সংরক্ষণের জন্য একটি কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, কমিটি খুব শীঘ্রই তাদের রিপোর্ট দাখিল করবে। পাশাপাশি, বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরসহ দেশের আরও কয়েকটি পুরাকীর্তি নিয়ে একটি প্রকল্প-প্রস্তাবনা সরকারের কাছে দাখিল করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত