দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কলা অত্যন্ত পরিচিত এবং সহজলভ্য একটি ফল। সকালের নাশতা, বিকেলের হালকা খাবার কিংবা শরীরচর্চার আগে তাৎক্ষণিক শক্তির উৎস হিসেবে কলার জুড়ি মেলা ভার। তবে সম্প্রতি এই সাধারণ ফলটি নিয়েই বিজ্ঞানের গবেষণাগারে ক্যানসার প্রতিরোধ ও শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। গবেষকেরা জানার চেষ্টা করছেন, কলার মধ্যে থাকা বিভিন্ন উপাদান ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে কতটা সক্ষম।
ল্যাবরেটরিতে করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কলার মধ্যে থাকা বেশ কিছু জৈবসক্রিয় যৌগ ক্যানসার কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। এমনকি এটি ক্যানসার আক্রান্ত কোষের সুনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুর প্রক্রিয়া বা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাপোপটোসিস’ সক্রিয় করতেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। এ পর্যন্ত হওয়া বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় অগ্ন্যাশয়, স্তন, যকৃত, কোলোরেক্টাল ও মুখগহ্বরের ক্যানসারসহ নানা ধরণের ক্যানসার মডেলে কলার নির্যাস এবং এর উপাদানগুলোর সম্ভাব্য কার্যকারিতার প্রমাণ মিলেছে।
তবে পরীক্ষাগারে কলার নির্যাস ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে কাজ করা আর মানুষের শরীরে কলার সরাসরি প্রভাবের মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে। গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত নির্যাসের পরিমাণ ও উপাদানের যে ঘনত্বের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়, তা একজন মানুষের সাধারণ খাদ্য হিসেবে খাওয়া কলার পরিমাণের সমান নয়। তাই শুধু ল্যাবরেটরির পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কলা খেলে ক্যানসার ভালো হবে বা প্রতিরোধ করা যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একেবারেই বৈজ্ঞানিক নয়। মানুষের শরীরে এর সঠিক কার্যকারিতা বুঝতে ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন রয়েছে।
পুষ্টিবিদ ও বিজ্ঞানীদের মতে, কলা শুধুমাত্র সাধারণ কার্বোহাইড্রেট ও পটাশিয়ামের আধার নয়। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফেনলিক যৌগ, ক্যারোটিনয়েড ও ফাইটোস্টেরলের মতো জৈবসক্রিয় উপাদান। শরীরের কোষের সুরক্ষা এবং ক্ষতিকারক ফ্রি রেডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এসব অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান দারুণ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে।
একটি বিশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, কলার শাঁস থেকে তৈরি বিশেষ নির্যাস মানুষের ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসার এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ধীর করে দেয়। একই সাথে এটি অ্যাপোপটোসিসের মাধ্যমে কোষের সুনিয়ন্ত্রিত বিনাশ ঘটাতেও সাহায্য করে। কিন্তু গবেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এটি সম্পূর্ণভাবেই কোষভিত্তিক একটি ল্যাব টেস্ট, মানুষের ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা কোনো গবেষণা নয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, মানবদেহের প্রতিটি কোষেরই একটি নির্দিষ্ট আয়ু থাকে। কোনো কোষ যখন কার্যকারিতা হারায় বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন শরীর নিজস্ব একটি প্রক্রিয়ায় তাকে ধ্বংস করে দেয়, যাকে অ্যাপোপটোসিস বা নিয়ন্ত্রিত কোষমৃত্যু বলা হয়। ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যার ফলে নষ্ট হয়ে যাওয়া কোষগুলো ধ্বংস না হয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে থাকে। এই কারণেই যদি কোনো উপাদান ল্যাবে ক্যানসার কোষের অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়াকে পুনরায় সচল করতে পারে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দেয়।
কলা কাঁচা থেকে পাকার সময়কাল পর্যন্ত এর পুষ্টিগুণ ও রাসায়নিক গঠনে অনেক পরিবর্তন আসে। পাকার সাথে সাথে এর রং, স্বাদ ও টেক্সচারের পরিবর্তনের পাশাপাশি ভেতরের জৈবসক্রিয় উপাদানগুলোরও রূপান্তর ঘটে। ইঁদুরের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি পাকা কলার নির্যাস প্রাণীর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অন্য একটি গবেষণায় পাকা কলার লেকটিন নামক উপাদান ইঁদুরের সাইটোকাইন ও টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর আলফা (টিএনএফ)-র মাত্রা পরিবর্তনে সাহায্য করেছে।
টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর বা টিএনএফ হলো এক ধরণের সিগন্যালিং প্রোটিন যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ক্যানসার জীববিজ্ঞানে এর আচরণ অত্যন্ত জটিল। এটি কখনো কখনো টিউমার প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করতে পারে, আবার অতিরিক্ত মাত্রায় এটি নানা শারীরিক জটিলতারও সৃষ্টি করতে পারে। তাই শুধু টিএনএফের মাত্রা বাড়লেই যে কোনো খাবার ক্যানসার রুখে দেবে, এমন ধারণা করা পুরোপুরি ভুল।
অনেকে মনে করেন অতিরিক্ত পাকা কলা ক্যানসারের জন্য বেশি উপকারী, তবে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে কোন পর্যায়ে পাকা কলা ক্যানসার প্রতিরোধে কাজ করবে, তার সপক্ষে এখনও নির্ভরযোগ্য কোনো ক্লিনিক্যাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই ক্যানসার এড়াতে কেবল বেশি পাকা কলা খাওয়ার পেছনে ছুটে লাভ নেই। ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, শরীরের সঠিক ওজন ধরে রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ক্যানসার প্রতিরোধের বিষয়টি একপাশে সরিয়ে রাখলেও কলা অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি ফল। এতে ভরপুর মাত্রায় কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ ও প্রয়োজনীয় খাদ্যআঁশ রয়েছে। এটি সহজে বহনযোগ্য এবং রান্নার কোনো ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি খাওয়া যায়। বিশেষ করে অ্যাথলেট বা নিয়মিত ব্যায়াম করা মানুষদের জন্য তাৎক্ষণিক শক্তি পেতে কলার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের অতি পরিচিত সাধারণ এই ফলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক গুণাগুণ নিয়ে বিজ্ঞান এখনও তার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, যা আগামী দিনে মানবদেহের সুরক্ষায় নতুন কোনো দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

