আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ: বিদায় বেলায় লিওকে ভালোবাসা

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ছিল এক যুগের সমাপ্তি। এই ম্যাচের মাধ্যমেই আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের ইতি ঘটল। একজন অগণিত ভক্তের স্মৃতিকথা থেকে উঠে এসেছে, কীভাবে এই ফুটবল জাদুকর তাঁর জীবনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। ২০০৬ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ বিশ বছরে মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন এক প্রজন্মের আবেগ আর ভালো লাগার কেন্দ্রবিন্দু। ভাবছি, লেখাটা কীভাবে শুরু করলে পরিপূর্ণ শোনাবে।

মেসির সঙ্গে ভক্তের পরিচয়টা বেশ অদ্ভুত। ২০০৬ সালে বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সময় লুকিয়ে রাখা এক ম্যাগাজিনের প্রথম পাতায় বাদামি চুলের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ১৩ বছর বয়সী সেই কিশোরী। ফুটবল তখন তাঁর কাছে তেমন পরিচিত বিষয় ছিল না, কিন্তু সেই ছবিই ছিল জীবনের প্রথম ‘ক্রাশ’। সেই থেকে শুরু হয় মেসিকে ঘিরে এক পাগলামি। হোস্টেল সুপারের কাছে মিথ্যা বলে বাড়িতে ফেরা, লুকিয়ে খেলা দেখা কিংবা খেলার পাতা থেকে মেসির ছবি কেটে রাখার মতো অসংখ্য স্মৃতি আজ ভিড় করছে মনের কোণে। কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের কখনো দেখা হয় না। উত্তরটা খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০০৬ সালে। ফুটবলের সঙ্গে তখন আমার দূরদূরান্তেরও কোনো সম্পর্ক ছিল না।

মেসির জন্মস্থান রোজারিও এবং নিজের পদবি রোজারিও হওয়ার যে কাকতালীয় মিল, তা নিয়েও আজও রোমাঞ্চিত হন এই ভক্ত। ইন্টার মায়ামিতে মেসির খেলা আর ফ্লোরিডা শহরের সঙ্গে নিজের নামের যোগসূত্র যেন এক অদ্ভুত আনন্দ দেয়। বিশ বছরের এই অভ্যস্ততা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। মেসিকে দেখতে দেখতে বড় হওয়া সেই ভক্ত আজ বুঝেছেন, মেসির প্রতিটি জয়ের সঙ্গেই তাঁর নিজের জীবনের একটি অংশ জুড়ে ছিল।

২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল ভক্তের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় এক রাত। আর্জেন্টিনার অনেক ভক্তের মতো তিনিও কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন। সেবার তিনি নিজের ঘরে একা খেলা দেখতেন এবং নানা নিয়ম মেনে চলতেন। ফাইনালের শেষ ৩০ মিনিট তো দেখার সাহসই করেননি। ল্যাপটপ বন্ধ করে বাইবেল হাতে প্রার্থনা করেছিলেন যেন ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি না হয়। প্রার্থনা ছিল এমন—নিজের জীবন থেকে এক বছর দিয়ে দিলেও যেন মেসি চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই জয় ছিল ভক্তের কাছে নিজের জয়।

এই আবেগ কেবল ২০২২ সালের বিশ্বকাপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এবারের ফাইনালের ক্ষেত্রেও খেলা শুরুর ১৫ মিনিট পর থেকে আর দেখার সাহস হয়নি তাঁর। আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচেও তিনি টিভির সামনে না বসে অন্য রুমে গিয়ে ক্রমাগত প্রার্থনা করে গেছেন। ডায়েরির পাতায় পাতার পর পাতা লিখেছেন ‘আর্জেন্টিনা জিতে গেছে’, যেন নিজের হাতেই জয় নিশ্চিত করছেন।

মেসি হয়তো কখনোই জানবেন না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তাঁর এক ভক্ত কতবার তাঁর জন্য কেঁদেছেন বা প্রার্থনা করেছেন। তিনি হয়তো জানবেন না, তাঁর অবসরের সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষ নিজের জীবনের একটি বড় অংশকেও বিদায় জানিয়েছেন। মাঠের জাদুকর মেসি হয়তো ডায়েরির তিনটি পাতায় নিজের অবসরের ঘোষণা দিয়ে হয়তো রাজকীয় বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর বিনয় ও শিশুসুলভ আবেগ ভক্তের হৃদয়ে সারাজীবন গেঁথে থাকবে। বিশ বছর ধরে একজনকে অনুসরণ করার পর আজ মনে হচ্ছে, সেই কৈশোরের প্রিয় মানুষটির বিদায়লগ্নে সব কিছু থমকে গেছে। ভালো থেকো লিও, তুমি ছিলে আমার কৈশোরের শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা। তাঁরা জানেনও না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কেউ তাঁদের আনন্দে খুশি হয়, তাঁদের মন খারাপ হলে নিজেও বিষন্ন হয়ে পড়ে। যতটা সহজে কথাটা লিখছি, বাস্তবটা ততটাই কঠিন হয়ে ধরা দিচ্ছে।