জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং গত দেড় দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্টের সঙ্গে জড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দল’-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের ব্যানারে থাকা ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকমণ্ডলী’। সোমবার (২৭ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে এ দাবিতে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, গত দেড় দশক ধরে নীল দল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সহযোগী শক্তি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তারা প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ শত শত শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পরও ১ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে নীল দলের শিক্ষকরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী মহলের ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়া সাদা দলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার হুমকি এবং ৩ আগস্ট মানববন্ধনে আন্দোলনকারীদের নাশকতার জন্য দায়ী করার মতো ঘটনাকে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ৩ আগস্ট রাতে নীল দলের কয়েকজন শিক্ষক গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি সমর্থন জানান। এমনকি আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি চালানোর সুপারিশ এবং শিক্ষার্থীদের শনাক্ত ও নির্যাতনের উদ্দেশ্যে সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশ ও ছাত্রলীগের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
জুলাই অভ্যুত্থানকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও স্মারকলিপিতে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। এতে বলা হয়, ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সময় প্রশাসন ও নীল দলের শিক্ষকরা কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি, বরং সন্ত্রাসীদের সহায়তা করেছেন। পরবর্তীতে ১৭ জুলাই হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীন অবস্থায় ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথনের অডিও রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
দীর্ঘ ১৭ বছরের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরে স্মারকলিপিতে বলা হয়, নীল দলের শিক্ষকরা ধারাবাহিকভাবে ভিন্নমতের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের তথ্য ছাত্রলীগসহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে সরবরাহ করেছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ সংস্কৃতির অস্তিত্ব অস্বীকার এবং সাদা দলের শিক্ষকদের বক্তব্য আক্রমণাত্মকভাবে এক্সপাঞ্জ করার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ভিন্নমতের শিক্ষকদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে হয়রানি, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা এবং রাজনৈতিক বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
সবশেষে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নীল দলের সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সাদা দল।

