অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অর্জিত ঐতিহাসিক সাফল্যের স্মৃতি ফিকে করে নিজেদের মাঠেই চরম বিপর্যয়ে পড়ল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নতুন চক্রে জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামলেও ঢাকা টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটে পরাজিত হয়েছে স্বাগতিকরা। চতুর্থ দিনেই ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ায় দুই টেস্টের সিরিজে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি পুরো দলের মানসিকতা ও পারফরম্যান্স নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ঘরের মাঠে এমন আত্মসমর্পণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি নিছক পরাজয় নয়, ক্রিকেটীয় অধঃপতন। পরিস্থিতি নয়, প্রশ্ন উঠছে খেলোয়াড়দের মানসিকতা নিয়ে। উত্তরটা লুকিয়ে আছে প্রতিটি বিভাগে। সঙ্গে ছিল ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝার অক্ষমতা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ খেলেছে আত্মঘাতী ক্রিকেট। বৃষ্টি আর আলোকস্বল্পতায় বারবার খেলা বন্ধ হয়েছে। সময়ের অভাব ছিল না, ছিল ক্রিকেট সেন্সের অভাব। দলের বিপদের দিনে দায়িত্ব নেওয়ার বদলে আত্মসমর্পণ। প্রায় সব ব্যাটারের মধ্যেই ছিল একই প্রবণতা।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ সাদমান ইসলামের শতকে ভর করে ২৭২ রান সংগ্র হ করেছিল। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস থামে ২৪৫ রানে। ২৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড হাতে থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়ে শান্তর দল। ৬ উইকেটে ৭৯ রান নিয়ে চতুর্থ দিন খেলতে নেমে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত অলআউট হয় মাত্র ১৪২ রানে। প্রথম টেস্টেই সেই স্বপ্নের করুণ পরিণতি। ২৭ রানের লিড পেয়েও রক্ষা পায়নি বাংলাদেশ। সাদমানের সেঞ্চুরি ছাড়া এই ইনিংসে উল্লেখযোগ্য কিছুই নেই। বাকিদের ব্যাটিং ছিল একেবারেই হতাশাজনক। বরং দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটাররা আত্মসমর্পণের প্রতিযোগিতায় নামলেন। ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটিতে তার লড়াইয়ে অন্তত সম্মান বেঁচেছে। সামনের সারির ব্যাটাররা অবশ্য সেই দায়িত্ব নেননি।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের টপ ও মিডল অর্ডারের দায়িত্বহীনতা ফুটে উঠেছে স্পষ্ট। দিনের প্রথম ওভারেই জাকের আলি ওয়ারিক্যানকে চার মারার পর পরবর্তী বলেই স্লিপে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন। তাওহীদ হৃদয় দুই ইনিংসেই অপ্রয়োজনীয় ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে নিজের উইকেট বিসর্জন দেন। একইভাবে স্পিনের বিরুদ্ধে বাজে টেকনিকের কারণে দুই ইনিংসেই আউট হন মেহেদী হাসান মিরাজ। শেষ দিকে নাঈম হাসানের ক্যারিয়ারসেরা লড়াকু ফিফটি না থাকলে বাংলাদেশের পরাজয়ের ব্যবধান আরও বাড়ত। ব্যাটিংয়ে দায়িত্বহীনতা, ফিল্ডিংয়ে হাস্যকর ভুল, বোলিংয়ে পরিকল্পনাহীনতা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিন আক্রমণের সামনে একেবারে অসহায় দেখিয়েছে স্বাগতিক ব্যাটারদের। ক্যারিবীয় বোলার জুমেল ওয়ারিক্যান পুরো ম্যাচে ৯টি উইকেট শিকার করেন। অন্য স্পিনার রস্টন চেইস দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে নিজের ১০০তম টেস্ট উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন। উইকেটে স্পিনারদের সাহায্য থাকলেও স্বাগতিক স্পিনাররা সেই সুবিধা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন; ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা ১৬ উইকেট নিলেও বাংলাদেশের তিন স্পিনার মিরাজ, তাইজুল ও নাঈম মিলে কোনো উইকেটই পাননি। ওয়ারিক্যান ম্যাচে নিয়েছেন ৯ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে ছুঁয়েছেন ক্যারিয়ারের শততম টেস্ট উইকেট।
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্যাচ মিসের মহোৎসব ফিল্ডিং বিভাগকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। সফরকারীদের প্রথম ইনিংসে ৬টি ক্যাচ ফেলার পর চতুর্থ দিনেও একই ভুল রিপিট হয়। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দ্বিতীয় স্লিপে ব্র্যান্ডন কিংয়ের সহজ ক্যাচ মিস করার পাশাপাশি আঙুলে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। পরবর্তীতে ইবাদত হোসেন লং অফে ৭১ রানে থাকা অবস্থায় আবারও কিংকে জীবনদান করেন। পরে ৭১ রানে আবার জীবন পেলেন কিং।
জয়ের জন্য ১৭০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ওয়ানডে মেজাজে মাত্র ৩৫.১ ওভারেই জয় নিশ্চিত করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। উদ্বোধনী জুটিতে জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিং দ্রুত রান তুলতে থাকেন। ক্যাম্পবেল ৪৯ রানে শরিফুল ইসলামের বলে বোল্ড হন এবং পরবর্তীতে তেজনারাইন চান্দারপলকে ফেরান হাসান মাহমুদ। ২ উইকেটে ১২০ রান ওঠার পর বাকি পথটুকু সহজেই পাড়ি দেন কিং ও ক্যাভেম হজ। অথচ সেই উইকেটেই ১৭০ রান তাড়া করল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সময় লাগল মাত্র ৩৫.১ ওভার। ব্যাট-প্যাডের মাঝখানে বিশাল ফাঁক রেখে খেলেছেন।
ব্র্যান্ডন কিং ১১৫ বলে ১০টি চার ও ১টি ছক্কায় ৮১ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন, যা তার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। অপরদিকে ক্যাভেম হজ ২৭ বলে ৩১ রানে অপরাজিত থাকেন। অভিজ্ঞ স্পিনার তাইজুল ইসলামের স্পিন আক্রমণকে সহজেই সীমানা পার করে ক্যারিবীয়দের বড় জয় এনে দেন তারা।
প্রথম টেস্টের এই শোচনীয় হারের পর আগামী বৃহস্পতিবার থেকে সিলেটে শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানোই এখন বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ। সিরিজ হার এড়াতে হলে শেষ ম্যাচে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং তিন বিভাগেই পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে স্বাগতিকদের।

