সিরাজগঞ্জের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘পিটুলি মাংস’। বিয়ে, দোয়া মাহফিল, চল্লিশা কিংবা আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার সামাজিক আয়োজনে এটি এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রান্নার সুনাম এখন আর কেবল সিরাজগঞ্জের সীমানায় আটকে নেই, বরং দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বাইরের এলাকা থেকে অতিথি এলে তাঁদের কাছে পিটুলি মাংসের আবদার থাকে সবচেয়ে বেশি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই রন্ধন ঐতিহ্য স্থানীয় মানুষের মেহমানদারির বিশেষ পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজনটি হয়ে ওঠে সর্বজনীন। বাইরে থেকে কেউ এলাকায় এলে পিটুলি খাওয়ানোর অনুরোধ করেন। সময়ের পরিবর্তনে পরিবেশনের ধরন বদলালেও পিটুলি মাংসকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ ও আবেগ এখনো অটুট।
এই খাবারের উৎপত্তির সঠিক সময়কাল প্রবীণদের স্মৃতিতেও নেই, তবে বাপ-দাদার আমল থেকেই এটি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা, বাগবাটি ও রতনকান্দি এবং কাজিপুরের বিভিন্ন এলাকায় মেজবানির অন্যতম প্রধান খাবার হিসেবে সমাদৃত। উৎসবমুখর এসব আয়োজনে গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। খাবারের আয়োজন থেকে শুরু করে পরিবেশন পর্যন্ত কোনো কাজেই তারা পারিশ্রমিক নেন না; বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সম্প্রীতিই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের ভাষ্য, বাপ-দাদার মুখে এই খাবারের প্রচলনের গল্প শুনেছেন তাঁরা। যাতে কোনো অতিথি খাবার পেতে সমস্যায় না পড়েন, সেদিকেও নজর রাখা হয়।
পিটুলি মাংসের আয়োজনে গ্রামের প্রতিটি বাড়ির নারী, পুরুষ ও শিশুকে আমন্ত্রণ জানানোর রীতি রয়েছে। অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে আগেভাগেই অতিথিদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়, যেখানে বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন—সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। আগে কলাপাতা ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন অনেক জায়গায় প্লাস্টিকের থালা-বাসনের ব্যবহার বেড়েছে। চাল ঢেঁকিতে গুঁড়া করার প্রচলিত পদ্ধতিও রয়েছে। রান্নার উপকরণ নির্বাচন থেকে শুরু করে গুঁড়া মেশানোর সঠিক সময়, প্রতিটি ধাপেই সতর্কতা জরুরি।
রান্নার আয়োজনে চলে কঠোর শৃঙ্খলা।
অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেল থেকেই বড় বড় ডেকচিতে রান্নার প্রস্তুতি শুরু হয়। বড় বড় ডেকচিতে রান্নার জন্য তৈরি করা হয় একাধিক চুলা। চুলার নিচে চট ব্যবহারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন আয়োজকেরা।
বাবুর্চির দিকনির্দেশনায় মাংস কাটা ও চুলার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়। মাঝরাত থেকে শুরু হয় মূল রান্না। পিটুলি তৈরির বিশেষ কারিগরি হলো গরু বা মহিষের মাংসের সাথে আতপ চালের তাজা গুঁড়া মেশানো। অভিজ্ঞ বাবুর্চি হোসেন আলীর মতে, এই গুঁড়া ভেজা অবস্থায় মাংসে মেশাতে হয় এবং রান্নার নির্দিষ্ট ধাপে নিখুঁত কৌশল অবলম্বন করতে হয়, যা খাবারটিকে ঘনত্ব ও অনন্য স্বাদ প্রদান করে। বাবুর্চির নির্দেশনা অনুযায়ী মাংস কেটে রান্নার উপযোগী করা হয়। অভিজ্ঞ বাবুর্চিরা দীর্ঘদিনের চর্চা ও পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতি অনুসরণ করেই এই খাবার তৈরি করেন।
খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ নিয়ম। ফজরের নামাজের পর থেকে অতিথিদের আপ্যায়ন শুরু হয় এবং সাধারণত সকাল ১০টার মধ্যে তা সম্পন্ন করা হয়। গৃহকর্তা বা বাড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি পুরো তদারকি করেন। অতিথিদের একসঙ্গে ভাত ও পিটুলি মাংস পরিবেশন করা হয়, আর তৃপ্তিদায়ক খাবারের শেষে পরিবেশন করা হয় ঘোল। সেখানে এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও আত্মীয়স্বজনের নাম থাকে। ভাত ও মাংস কলাপাতায় পরিবেশনের সেই রীতি ছিল আয়োজনের পরিচিত দৃশ্য। পরিবেশনের জন্য আলাদা লোক দায়িত্ব পালন করেন।
এই খাবারের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পিপুলবাড়িয়া এলাকার ৭০ বছর বয়সী আবুল হোসেন বলেন, পিটুলি মাংস ছাড়া অনেক দাওয়াতই এখন অসম্পূর্ণ মনে হয়। কাজিপুরের মাইজবাড়ি এলাকার আয়নাল হকের ভাষ্যমতে, এই স্বাদের টানেই ঢাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও কাজিপুর থেকে বাবুর্চি নিয়ে গিয়ে পিটুলি মাংস রান্না করানো হয়। এভাবে সিরাজগঞ্জের এই বিশেষ খাবারটি তার স্বতন্ত্র স্বাদ ও আতিথেয়তার গুণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে এবং নিজের ঐতিহ্য অটুট রাখছে। এর ফলে খাবারে আসে স্বতন্ত্র ঘনত্ব ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বাদ।

