তৈরি পোশাক শিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী বড় সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এই নতুন চালিকাশক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।
শনিবার সকালে রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড বিইএআর সামিট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও ডিপ-টেক উদ্ভাবনের কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী এই সম্মেলনকে কেবল একটি সাধারণ আয়োজন নয়, বরং আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার কারিগরদের মিলনমেলা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। তাদের অনেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ সামিটে অংশ নিয়েছেন। বর্তমান সরকার একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বদ্ধপরিকর।
চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের যুগে সেমিকন্ডাক্টরকে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন এবং মহাকাশের স্যাটেলাইট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য।
বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টরের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের মধ্যেই গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে যাচ্ছে। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের জন্য অপার সুযোগ রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে নির্ধারিত রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই খাতের উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প মালিক, উদ্যোক্তা এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের একযোগে এই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
এ খাতকে ত্বরান্বিত করতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলতি বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর থেকে সব ধরনের কর ও শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন উদ্ভাবন বাস্তবায়নে সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ অনুদান’ বরাদ্দ রেখেছে, যার বণ্টন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে সরকারপ্রধান বলেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ টানতে শুল্কমুক্ত বন্ডেড সুবিধা প্রদান এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। বিদ্যমান হাই-টেক পার্কগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি নতুন বায়োটেক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের কঠিন প্রতিযোগিতার কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা রয়েছে। আমাদের মেধা, দক্ষ তারুণ্য এবং উদ্ভাবনী শক্তির ওপর ভর করেই আমরা এই লক্ষ্য অর্জন করব। সরকার আপনাদের স্বপ্ন ও অদম্য ইচ্ছাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে পাশে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, এই সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন অংশীদারিত্ব, গবেষণা উদ্যোগ এবং বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। অনুষ্ঠান শেষে তিনি সামিটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।
‘বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং সিলিকন রিভার বাংলাদেশ কর্মসূচির অংশীদারত্বে দুই দিনব্যাপী এই সামিটের আয়োজন করা হয়েছে।
সামিটের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত বিইএআর ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬-এ শিক্ষার্থী ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি, ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেম এবং অন্যান্য ডিপ-টেক খাতের উদ্ভাবন প্রদর্শিত হয়। মোট ৩৫টি স্টলে সাজানো এই এক্সপো ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী।

