হত্যা-মাদক-কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডবে সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর যেন আতঙ্কের জনপদ

চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়ন ক্রমশ পরিণত হচ্ছে হত্যা, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডবলীলার এক ভীতিকর এলাকায়। ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, মাদকের অবাধ কারবার, কিশোর গ্যাংয়ের দাপট, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, ককটেল বিস্ফোরণ এবং হত্যা মামলার আসামিদের নির্ভয়ে চলাফেরার অভিযোগে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ চললেও কার্যকর প্রতিরোধ না থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত বিরোধ ও মাদক সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে বিগত সময়ে মুরাদপুর ইউনিয়নের আবুল কালাম, এনামুল করিম সজিব, কোরবান আলী, মুমিনুল হক, রাসেল ও মুসলিম উদ্দিনসহ একাধিক ব্যক্তি পৃথক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্রও দাখিল করেছে পুলিশ। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, একাধিক হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিরা এখনও গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছেন। এতে অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভীতি না থাকায় বরং তাদের দুঃসাহস আরও বেড়েছে।

সম্প্রতি ইয়াবা কারবারি হিসেবে পরিচিত ইরান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে শামীম হত্যা এবং কিশোর নাঈম হত্যার অভিযোগ ঘিরে পুরো মুরাদপুরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, নাঈমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শক্তির মহড়া চালায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। পরিস্থিতির একপর্যায়ে গত ২৫ জুলাই গভীর রাতে ক্ষুব্ধ জনতা ইরানকে পিটিয়ে হত্যা করে এবং তার বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। দীর্ঘদিনের অপরাধ, নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল এই ঘটনা।

মুরাদপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. আকবর হোসেন আমার দেশকে বলেন, এখন সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে সাহস পান না। মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।

নিরাপত্তাহীনতার কারণে বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের এ কে খান এলাকায় বসবাসরত প্রবাসী আকবর হোসেন বাদল আমার দেশকে বলেন, পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই জন্মভিটা ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করতে হচ্ছে। নিজের এলাকায় নিরাপদে থাকতে না পারার কষ্ট সব সময়ই বয়ে বেড়াচ্ছি।

স্থানীয় কৃষক সফিউল আলম বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ। শান্তিতে মাঠে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে চাই। কিন্তু অস্ত্র, মাদক ও সন্ত্রাসের কারণে প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করতে হয়।

মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য এজাহার মেম্বার আমার দেশকে বলেন, হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালে মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। মাদক ও সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ইতোমধ্যে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাস শুরু করেছে। সন্ধ্যার পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘর থেকে বের হতে সাহস পান না।

অভিযোগের বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন আমার দেশকে বলেন, হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামিদের নিয়মিত গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ টিম কাজ করছে। তবে অনেক মাদক কারবারি আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারপরও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, মাদক নির্মূলে উপজেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। মুরাদপুর এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশি টহল, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডে অপরাধ দমনে শুধু মামলা গ্রহণ বা নিয়মিত অভিযান যথেষ্ট নয়। হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা জরুরি। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণেরও বিকল্প নেই।