দৈনন্দিন চলাফেরায় হুট করে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া হৃদরোগের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তি জানান, আগে প্রতিদিন বিকেলে কোনো ক্লান্তি ছাড়াই নিয়মিত হাঁটতেন, কিন্তু এখন সামান্য হাঁটলেই বুক ভারী হয়ে আসে ও হাঁপিয়ে ওঠেন। তার স্ত্রী জানান, তিন-চারতলা সিঁড়ি ভাঙলে তার দম বন্ধ হওয়ার মতো অনুভূতি হয়। অনেকেই এসব লক্ষণকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু চিকিৎসকদের মতে এটি হৃদরোগের লক্ষণ হতে পারে। পঞ্চাশোর্ধ এক রোগী বলছিলেন কথাগুলো। অথচ শরীরের এই ছোট ছোট পরিবর্তন কখনো কখনো হৃদ্রোগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। ফলে ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।
আমাদের শরীর অনেকটা সংবেদনশীল ও সহনশীল। হৃৎপিণ্ডের রক্তনালিতে চর্বি বা কোলেস্টেরল জমে সরু হয়ে গেলেও শরীর দীর্ঘ সময় তা মানিয়ে নিতে পারে, তাই শুরুতে উপসর্গ বোঝা যায় না। কিন্তু পরিশ্রমের সময় হার্টের অক্সিজেনের চাহিদা বাড়লে সরু রক্তনালিতে রক্ত সরবরাহ অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে বুকে চাপ, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে রক্তনালির আস্তরণ ফেটে রক্ত জমাট বেঁধে ব্লক তৈরি হয়, যা থেকে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। উদ্বিগ্ন স্বামী-স্ত্রীর প্রশ্ন, এসব উপসর্গ কি হার্টের সমস্যার জন্য হচ্ছে। এটি যেমন সংবেদনশীল, তেমনি আশ্চর্য রকম সহনশীলও। এই ব্লকের কারণে রক্তপ্রবাহ গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হলে ঘটতে পারে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক।
শারীরিক পরিশ্রমের সময় অস্বাভাবিক হাঁপিয়ে ওঠা, যেমন আগে ৩০ মিনিট অনায়াসে হাঁটতে পারলেও এখন ১০-১৫ মিনিটে থেমে যাওয়া, বা সিঁড়ি ভাঙার সময় বুক ভারী লাগা হৃদরোগের সতর্কবার্তা। এছাড়া আরও কিছু লক্ষণের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন
- হাঁটার সময় বুকে চাপ বা অস্বস্তি অনুভব করা।
- অল্প পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা হাঁপিয়ে যাওয়া।
- কাজের ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে যাওয়া।
- অকারণে অতিরিক্ত দুর্বল বা ক্লান্ত থাকা।
- মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম করা।
- পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া।
- শুয়ে থাকার সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
তবে মনে রাখা জরুরি, এসব লক্ষণ মানেই যে হৃদরোগ, তা নয়। ফুসফুসের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েড, স্থূলতা বা অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণেও এমন হতে পারে। তাই সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে বেশি কোলেস্টেরল, স্থূলতা, ধূমপানের অভ্যাস বা পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাস যাদের আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো অস্পষ্ট হতে পারে, তাই ঝুঁকি বেশি থাকলে সামান্য পরিবর্তনেও সচেতন হতে হবে।
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস ও লক্ষণগুলো পর্যালোচনা করেন। এরপর রক্তচাপ ও শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রামের মতো পরীক্ষা করা হয়। স্বাভাবিক ইসিজি বা ইকো মানেই যে রক্তনালিতে সমস্যা নেই, তা কিন্তু নয়। প্রয়োজনে ট্রেডমিল টেস্ট বা সিটি করোনারি এনজিওগ্রামের মতো উন্নত পরীক্ষা করা হতে পারে। চিকিৎসার ধরনে ওষুধ, এনজিওপ্লাস্টি বা রিং স্থাপন কিংবা বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে, যা ব্লকেজের অবস্থান ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে। তবে নিজের ইচ্ছায় পরীক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পরীক্ষা করা উচিত।
বুকে তীব্র ও চাপ ধরার মতো অস্বস্তি যদি কয়েক মিনিট স্থায়ী হয় বা বারবার ফিরে আসে এবং সাথে ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব ও শ্বাসকষ্ট থাকে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। হৃদরোগ প্রতিরোধে ধূমপান পরিহার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রক্তচাপ, গ্লুকোজ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। শুরুতে বর্ণিত ওই রোগীর ক্ষেত্রেও সময়মতো চিকিৎসার ফলে ব্লকেজ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল এবং এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে তিনি এখন সুস্থ আছেন। দেহঘড়ি আমাদের নানা সংকেতের মাধ্যমে সতর্ক করে, তাই ছোটখাটো পরিবর্তনকেও গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।

