১৩ বছর পর টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা মোহাম্মদ শামির

মাত্র ১৭ বলের একটি বিধ্বংসী স্পেল দিয়েই যেন মোহাম্মদ শামির টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রকৃত রূপটি ফুটে উঠেছিল। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে লাল বল হাতে শামি দেখিয়েছেন তার অদম্য সাহস, আগুন আর নিখুঁত বোলিং দক্ষতার অপূর্ব মেলবন্ধন। ২০১৮ সালে জোহানেসবার্গে চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে দক্ষিণ আফ্রিকা যখন ২৪১ রানের জয়ের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৫৭ রানে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, ঠিক তখনই তাদের মুখোমুখি হতে হয় রিভার্স সুইং ও পুরোনো বলের অন্যতম সেরা রূপকার শামির। গতিময় ইয়র্কার এবং নিখুঁত লাইনে প্রোটিয়াদের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়ে ভারতকে ৬৩ রানের অবিস্মরণীয় এক জয় উপহার দিয়েছিলেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাসের ঘর ও বিশাখাপত্তনমের ধ্বংসস্তূপ

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে শামির এই সাফল্য কেবল একটি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২১ সালের সেঞ্চুরিয়নে অনুষ্ঠিত বক্সিং ডে টেস্টে ভারত যখন ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নেয়, সেখানেও প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে মূল নায়ক ছিলেন শামি। সেবার প্রোটিয়াদের প্রথম সারির তিন ব্যাটারকে সাজঘরে ফেরানোর পর দ্বিতীয় ইনিংসেও আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করেন তিনি।

তবে ক্যারিয়ারের সেরা চতুর্থ ইনিংসের ধ্বংসাত্মক রূপটি দেখা গিয়েছিল বিশাখাপত্তনম টেস্টে। তৎকালীন অধিনায়ক বিরাট কোহলির আগ্রাসী মানসিকতার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলেন শামি। সেবার দ্বিতীয় ইনিংসে ১০.৫ ওভারে ২ মেইডেনসহ ৩৫ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন তিনি। পরিসংখ্যানে সেই সময়ের ভয়াবহতা পুরোপুরি প্রকাশ না পেলেও ফাফ দু প্লেসির আউটটি এখনও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। লেংথ বলটি ছেড়ে দিয়ে স্টাম্প ভেঙে যাওয়ার পর দু প্লেসির হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি শামির সিম মুভমেন্টের নিখুঁততার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

সিম পজিশনের জাদু ও অনন্য বোলিং শৈলী

মোহাম্মদ শামির হাত থেকে বের হওয়া লাল বল প্রতিপক্ষের জন্য নিয়ে আসত নানামুখী বিপদ। উইকেট থেকে বাড়তি সুবিধা না মিললেও তিনি অদ্ভুত দক্ষতায় বল ভেতরে বা বাইরে সুইং করাতে পারতেন। নতুন চকচকে বলকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার পাশাপাশি পুরোনো বলে রিভার্স সুইং করানো ছিল তার অন্যতম সেরা শক্তি। আর এই সব সাফল্যের মূলে ছিল তার সোজা এবং নিখুঁত ‘সিমে’ বল ফেলার ক্ষমতা। স্লো-মোশনে তার ডেলিভারি দেখলে মনে হতো তা যেন কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অতিপ্রাকৃতিক বস্তু।

মাঠে বল হাতে চরম আগ্রাসী হলেও শামি কখনোই স্লেজিংয়ের পথ বেছে নেননি। সাবেক ভারতীয় কোচ রবি শাস্ত্রী কীভাবে তাকে খাওয়ার টেবিলে উদ্বুদ্ধ করতেন আর সেই ক্ষোভ তিনি মাঠে উগরে দিতেন—এমন গল্প প্রচলিত থাকলেও প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের সাথে তিনি সবসময়ই ভদ্র আচরণ করেছেন। স্টাম্প ভেঙে দুই টুকরো করে উদযাপনে মাতলেও কখনোই ব্যাটারের মুখের সামনে গিয়ে তা প্রদর্শন করেননি।

পরিসংখ্যানের আলোয় শামির অর্জন ও স্মরণীয় কীর্তি

৬৪ টেস্টের ক্যারিয়ারে ২৭.৭১ গড়ে মোট ২২৯টি উইকেট নিয়ে লাল বলের ফরম্যাটকে বিদায় জানালেন শামি। ঘরের মাঠে তার বোলিং গড় ছিল আরও অসাধারণ, যা প্রায় পাঁচ পয়েন্ট কমে এসেছিল। এশিয়ার মাটিতে ৭৫ বা তার বেশি উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে কেবল কুলদীপ যাদব এবং ওয়াকার ইউনূসের স্ট্রাইক রেট শামির ৪১.৮ স্ট্রাইক রেটের চেয়ে ভালো।

দেশের বাইরে ভারতের পেস বিপ্লবের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন শামি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে পার্থের বাউন্সি উইকেটে তার ক্যারিয়ার সেরা ৫৬ রানে ৬ উইকেটের বোলিং স্পেলটি ভারতীয় বোলিং ইতিহাসের অন্যতম সেরা উদাহরণ। ম্যাচটি ভারত না জিতলেও দ্বিতীয় ইনিংসে শর্ট বল ও গুড লেংথ ডেলিভারির মিশ্রণে শামি প্রমাণ করেছিলেন যেকোনো পিচে তিনি কতটা কার্যকর।

চোটের ধাক্কা, পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন

২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে গোড়ালি ও একিলিস টেন্ডনের ইনজুরি সত্ত্বেও ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে খেলেছিলেন শামি। ৭ ম্যাচে ২৪ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের শীর্ষ উইকেটশিকারি হয়ে ভারতকে ফাইনালে তুলতে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তবে এর চরম মূল্য দিতে হয় পরবর্তীতে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। পরবর্তীতে পুনর্বাসন চলাকালীন হাঁটুতে ফোলাভাব দেখা দিলে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি থেকে ছিটকে যান।

১৪ মাসের দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে ২০২৪ সালের শেষের দিকে রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার হয়ে লাল বলের ক্রিকেটে ফেরেন শামি এবং ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন করেন। দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরলেও টেস্ট ক্রিকেটে তার ফেরা আর সম্ভব হয়নি।

১৩ বছর পূর্তিতে লাল বলের ক্রিকেটকে চূড়ান্ত বিদায়

৬ নভেম্বর, যে দিনে ঠিক ১৩ বছর আগে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক করেছিলেন, ঠিক সেই একই দিনে বিদায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন শামি। ৮০-র বেশি টেস্ট এবং ২৫০-র বেশি উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করা তার মতো মানের বোলারের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হলেও, চোটের কারণে বহু ম্যাচ মিস করায় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাকে। তবুও, ভারতকে একটি শক্তিশালী পেস অ্যাটাক নির্ভর দল হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে শামির অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।