৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারে বিশ্ব ঋণ, সংকটে শীর্ষ দেশগুলো

বিশ্বজুড়ে সরকার, পরিবার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণের পাহাড় বাড়ছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এই ঋণের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে মোট ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই হিসাবে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাঁধে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ডলারের ঋণের বোঝা চেপেছে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকেই মূলত এই ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে।

উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো এখন ঋণের সুদ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। গত এক বছরে তারা সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধ বাবদ ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অঙ্ক বিশ্বের সামরিক খাতের ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বার্ষিক ব্যয়ের চেয়েও বেশি। সুদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় উন্নয়নমূলক বাজেটে টান পড়ছে, যার ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের মতো জনসেবামূলক খাতে বরাদ্দ কাটছাঁট করতে হচ্ছে সরকারগুলোকে। বছরের পর বছর বিপুল ঋণ নেওয়ায় ইউরোপের অনেক দেশই এখন গভীর ঋণসংকটে পড়েছে। বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণে ভারত সপ্তম। বন্ড কেনার বিনিময়ে সরকার ক্রেতাদের সুদ দেয় এবং নির্দিষ্ট তারিখে ঋণের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

সরকারি ঋণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে বর্তমানে ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ রয়েছে, যা তাদের জিডিপির ১২৭ শতাংশ। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা মার্কিন ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা থাকায় দেশটিতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি থাকলেও বর্তমানে সেখানে ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপরও, কারণ সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে গৃহঋণ, গাড়ি ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও ঊর্ধ্বমুখী হয়। কোনো পরিবারের গৃহঋণের সুদ বাড়লে যেমন সংসার খরচে টান পড়ে, সরকারের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়।

ফ্রান্স বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য দেশটিকে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। যেমন—১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো এমন একটি ঋণ, যা সরকারকে ১০ বছর পর পরিশোধ করতে হয়।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো সেখানেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষায় বাজেট ঘাটতির প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে।

গত শনিবার ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছিল।

বিক্ষোভকারীদের দাবি, ঋণের সুদ মেটাতে গিয়েই সরকার জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের ঋণ জিডিপির ১২১.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বের শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে চীন। তাদের ঋণের পরিমাণ ২২.৫০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা জাপানের ঋণ ৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১৯৯ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে যুক্তরাজ্য (৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১০২ শতাংশ) এবং পঞ্চম স্থানে ফ্রান্স (৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১১৮ শতাংশ) অবস্থান করছে। এ ছাড়া ইতালির ঋণ ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, জার্মানির ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ভারতের ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই। দেশটির অর্থনীতির তুলনায় ঋণের বোঝা অনেকটাই বেশি, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। আর জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৬৫ শতাংশ। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন, যা দেশটির জিডিপির ৮৩ শতাংশ। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

এই বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪.৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির ৪০ শতাংশ। দেড় দশক আগে ২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০.৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, গত ১৫ বছরে দেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। তবে উন্নত বিশ্বের সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের ঋণ ও জিডিপির অনুপাত এখনো তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বন্ড বিক্রির মাধ্যমে সরকারগুলো ঋণ সংগ্রহ করে থাকে, যেখানে সুদের হার বা ‘ইল্ড’ বাজারের আস্থার প্রতিফলন ঘটায়। বন্ডের দাম কমলে সুদের হার বেড়ে যায়, যা অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলো ৫ শতাংশের বেশি সুদে ঋণ নিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্রান্স সেই পর্যায়ে পৌঁছানোয় উদ্বেগ বাড়ছে। সুদ পরিশোধের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক দেশকেই এখন কর বাড়ানো বা ব্যয় সংকোচনের কঠোর পথ বেছে নিতে হচ্ছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়া এসব বিক্ষোভে কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। উল্লেখ্য, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় শুধু গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়েছিল। একটি দেশ তার ঋণ ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবে, সে বিষয়ে আর্থিক বাজারের আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।