রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে চলন্ত ট্রাকে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ট্রাকচালক নওশাদ নসুর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলা ২৭ বছর ধরে ঝুলে আছে। ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর বিএনপি’র ডাকা হরতাল চলাকালে মতিঝিল থানার উত্তর শাহজাহানপুরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে এই ঘটনা ঘটে। অগ্নিদগ্ধ ট্রাকচালক ও হেলপারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নওশাদ নসু মারা যান। ঘটনার পর মতিঝিল থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে মামলাটি দায়ের করেন, যা মতিঝিল থানার ১৬৯ নম্বর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
মামলাটি দায়েরের পর তদন্তে পুলিশের প্রায় তিন বছর সময় লাগে। ২০০২ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। শুরুতে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ ২৯ জনকে আসামি করা হলেও, অভিযোগপত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। তদন্ত শেষে মির্জা আব্বাসসহ ২০ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং বাকি আটজনের বিরুদ্ধে বিচারকাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই থেকে দীর্ঘ ২৪ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচারকাজ এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই আটকে আছে। অভিযোগপত্রে ১৭ জন সাক্ষীর নাম থাকলেও দীর্ঘ ২৭ বছরে তাদের কেউই আদালতে এসে সাক্ষ্য দেননি।
মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন এসআই মাহবুবুর রহমান, এসআই ইসহাক মল্লিক, এসআই রফিকুল ইসলাম, এএসআই হারুনুর রশীদ, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের লেকচারার ডা. মোস্তাক রহিমসহ অন্যরা। তাদের আদালতে হাজির করতে একাধিকবার সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এমনকি জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেও সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালে মামলার বাদী এসআই নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও আদালত জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন, কিন্তু তাকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬০ বার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। প্রতিবারই রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে সাক্ষী হাজির করার জন্য সময় চাওয়া হয়েছে এবং আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন। ফলে মামলাটি এগিয়ে যাওয়ার বদলে শুধু নতুন তারিখের পর তারিখ পড়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বারবার মামলাটি খারিজের আবেদন জানালেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। বরং প্রতিবারই নতুন করে সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একদিকে সাক্ষী নেই, অন্যদিকে মামলাও নিষ্পত্তি হচ্ছে না, যার ফলে আটজন আসামি বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা দিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
মামলাটি ২০০২ সালের মার্চে বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে এটি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালত এবং ঢাকার পরিবেশ আপিল আদালতে (বিশেষ দায়রা জজ আদালত) স্থানান্তর করা হয়। আদালত বদল হলেও মামলার পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। আসামিপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট শাকিল আহমেদ রিপন বলেন, কাউকে বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেল ও হয়রানি করা অমানবিক। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক মামলা। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ার পরও মামলাটি খারিজ না করে বারবার তারিখ দেয়া বিচারবিভাগের একটি অমানবিক দিক।
আরেক আইনজীবী এডভোকেট জয়নাল আবেদীন মিসবাহ বলেন, হরতালের সময় তৎকালীন সরকারের চাপে পুলিশ বিএনপি নেতাদের ফাঁসাতে এই সাজানো মামলাটি দায়ের করেছিল। তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য বা মেডিকেল অফিসার—কাউকেই আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না, অথচ মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আসামিরা অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছেন। তিনি জানান, এই ধরনের মামলা খারিজ হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না, তাই তারা বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনার পরিকল্পনা করছেন।

