কক্সবাজারের রামু উপজেলায় সংরক্ষিত বনভূমির জমি দখল করে গড়ে তোলা পানবরজ উচ্ছেদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বন বিভাগের কর্মীরা। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতিপাড়া এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে অতর্কিত এই হামলায় পানেরছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তাসহ মোট পাঁচজন বনকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে আহতদের কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আহত বনকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন পানেরছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা শরীফুল আলম, ফরেস্ট গার্ড হুমায়ুন কবির, বাগানমালি সাইদুল ইসলাম ও মো. সাজিদ এবং ইআরটি সদস্য মিজানুর রহমান। তাদের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হামলায় রেঞ্জ কর্মকর্তাসহ দুজনের মাথা ফেটে গেছে এবং বাকি তিনজনের হাত ভেঙে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন।
হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পানেরছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা শরীফুল আলম জানান, পানেরছড়া বিটের সমিতিপাড়া এলাকায় সংরক্ষিত বনের জমি দখল করে পানবরজ নির্মাণের সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তারা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেরার পথে স্থানীয় বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিন, নাজির হোসেন ও সাহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হয়। এই হামলায় তারা গুরুতর জখম হয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অভিযুক্তদের মধ্যে জসিম উদ্দিন দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে পরিচিত। তবে নাজির হোসেন ও সাহাব উদ্দিনের দলীয় পদবি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবছার জানান, তিনি ঘটনার কথা শুনেছেন কিন্তু বিস্তারিত তথ্য তার কাছে নেই। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন বলে জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন যে, পানবরজ নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে স্থানীয়দের বিরোধ দীর্ঘদিনের এবং এর আগেও এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা ঘটেছে, যা এখন ব্যক্তিগত রেষারেষির রূপ নিয়েছে।
কক্সবাজার সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী শফিউল আলম জানিয়েছেন, আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর পাশাপাশি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। সোমবার বিকেলের মধ্যেই এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। বন বিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বন বিভাগের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধী যেই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে, দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বনকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ফরেস্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)। সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে মাঠপর্যায়ে কর্মরত বনকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবেই এই উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। তবে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বাধার মুখে পড়ে বনকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি দায়িত্ব পালনকালে এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।

