মোহাম্মদ রিজওয়ান বর্তমানে এক অদ্ভুত ও অনিশ্চিত আইনি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যা যেন ফ্রাঞ্জ কাফকার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’-এর কোনো চরিত্রের অসহায়ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। কাফকার উপন্যাসের সেই নায়কের মতোই রিজওয়ান নিজেও আপাতদৃষ্টিতে এবং প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, কী তার আসল দোষ, কে বা কারা তার বিরুদ্ধে এই মারাত্মক অভিযোগ এনেছে এবং ঠিক কী কারণে তাকে এমন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন। এই কাফকাসুলভ পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি এখন নিজের সম্মান ও ন্যায়বিচারের আশায় লড়াই করছেন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও রহস্যময় সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন জব্দ করার বিষয়টি। দীর্ঘ সময় ধরে তার ফোনটি নিজের কব্জায় রেখেছে তদন্তকারী সংস্থা, অথচ এর সুনির্দিষ্ট বা আইনি কোনো কারণ তাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়নি। রিজওয়ানের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, “কোনো লিখিত নোটিশ, কোনো লিখিত দাবি, কোনো অভিযোগ, কোনো চার্জ, কোনো ওয়ারেন্ট, কোনো রসিদ এবং কোন নথিপত্র দেওয়া হয়নি যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় যে ঠিক কীসের ভিত্তিতে আমার ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।”
গভীর রাতের তলব ও আকস্মিক জিজ্ঞাসাবাদ
এই অদ্ভুত ঘটনার সূত্রপাত ঘটে লন্ডনের একটি হোটেল রুমে। গত ৩০ আগস্ট লর্ডস টেস্টের সমাপ্তির পর গভীর রাতে (আনুমানিক রাত ১টার দিকে) ঘুমন্ত রিজওয়ানকে জাগিয়ে তোলা হয়। পিসিবির অ্যান্টি-করাপশন কর্মকর্তা (কর্নেল আখতার) তাকে হোটেলের নিচে লবিতে নেমে আসার নির্দেশ দেন এবং বিশেষভাবে বলেন যেন তিনি সাথে করে নিজের মোবাইল হ্যান্ডসেটটি নিয়ে আসেন।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, গভীর রাতের সেই সময়ে লবিতে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এফআইএ) একজন গোয়েন্দা সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, এফআইএ-এর নিজস্ব ডিরেক্টর জেনারেল রয়েছেন যিনি আইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, তবে এই সংস্থাটি সরাসরি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। আর এই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন মহসিন নাকভি, যিনি একই সাথে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
রিজওয়ান নিচে নেমে এলে একজন দলীয় কর্মকর্তা তাকে এফআইএ কর্মকর্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তদন্তে সহযোগিতা করার পরামর্শ দেন। এরপর রিজওয়ানের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও তার মোবাইলটি কেড়ে নেওয়ার আগে বেটিং এবং অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত নানা প্রশ্নবাণে তাকে জর্জরিত করা হয়। তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে বা কোন ঘটনার তদন্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে তাকে কিছুই জানানো হয়নি।
আদালত ও কর্তৃপক্ষের কাছে রিজওয়ানের আকুতি
হাতে আসা লাহোর হাইকোর্টে দায়ের করা আপিল আবেদনে রিজওয়ান লর্ডস টেস্টের ঠিক পরের সেই চরম অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন: “গত ২৭.০৮.২০২৬ থেকে ৩০.০৮.২০২৬ তারিখের মধ্যে অনুষ্ঠিত লর্ডস টেস্ট ম্যাচের পর পরই আমাকে হোটেলের লবিতে তলব করা হয়, যেখানে দলের সবাই অবস্থান করছিলেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং কোনো প্রকার কারণ বা যৌক্তিকতা না দেখিয়েই আমার মোবাইল ফোনটি জব্দ করেন। আমাকে এমন কোনো আদেশও দেখানো হয়নি যার ভিত্তিতে আমার ব্যক্তিগত ডিভাইসটি তারা গ্রহণ করতে পারেন।”
রিজওয়ান জানান, মাত্র ৩ ঘণ্টার মধ্যে ডিভাইসটি পরীক্ষা করে তা ফেরত দেওয়ার মৌখিক আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি ফোনটি হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসের পর সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত ফোনটি তাকে ফেরত দেওয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষকে লেখা চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন: “আমাকে কোনো লিখিত নোটিশ, লিখিত দাবি, অভিযোগনামা, ওয়ারেন্ট বা রসিদ দেওয়া হয়নি। আমি অত্যন্ত দ্বিধান্বিত ছিলাম এবং বারবার ফোনটি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম কারণ আমাকে বলা হয়নি আমার অপরাধ কী বা কোন তদন্তের স্বার্থে এটি নেওয়া হচ্ছে।”
২০১০ সালের লর্ডস কেলেঙ্কারির প্রতিধ্বনি ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই চাঞ্চল্যকর বিতর্কটি অনেকের মনেই ২০১০ সালের সেই কুখ্যাত লর্ডস স্পট-ফিক্সিং কেলেঙ্কারির স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যেখানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টেই পাকিস্তানি ক্রিকেট জর্জরিত হয়েছিল বড় ধরনের বিতর্কে। তবে আইনজীবীদের মতে, এবারের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো স্টিং অপারেশন বা ফাঁদ পাতার প্রমাণ মেলেনি। প্রখ্যাত আইনজীবী রিজভী এই প্রসঙ্গে বলেন, “২০১০ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তির কথা বলা এই মুহূর্তে কিছুটা সময়ের আগে বলা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরেই কেবল প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।”
আইসিসির নিয়মাবলী নিয়ে রিজভী আরও স্পষ্ট করেন যে, আইসিসি অ্যান্টি-করাপশন কোডের আর্টিকেল ১.১১ অনুযায়ী খেলোয়াড়দের নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলা এবং তদন্তে সহযোগিতা করা বাধ্যতামূলক। রিজওয়ান আদালতের কাছে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পিসিবি, এফআইএ বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নালিশ করছেন না, বরং তিনি শুধুমাত্র তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
পাকিস্তানের হয়ে ২৫৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ (৪৭টি টেস্ট, ১০৩টি ওয়ানডে ও ১০৬টি টি-টোয়েন্টি) খেলা এই সাবেক অধিনায়ক এখন নিজের সুনাম ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করছেন। অথচ এই চলমান তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে তাকে পাকিস্তানের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্ট ‘প্রেসিডেন্টস ট্রফি গ্রেড ১’-এ খেলার অনুমতি দেওয়া হয়নি, যেখানে যুক্তরাজ্য সফর থেকে ফিরে আসা অন্যান্য প্রায় সব ক্রিকেটারই অংশ নিচ্ছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা
লাহোর হাইকোর্টে দায়ের করা পিটিশনে রিজওয়ান ব্লাকমেইল, ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। বিনা আইনি নোটিশে ফোন জব্দ রাখা ও অনির্দিষ্টকালের জন্য তা আটকে রাখাকে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন।
আদালত বর্তমানে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। একটি আদেশে আদালত জানিয়েছে, “এই পর্যায়ে আদালত সতর্কতা অবলম্বন করা এবং উপযুক্ত সংস্থাকে তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়াটাই সমীচীন মনে করছে।” বর্তমানে রিজওয়ানকে শুধুমাত্র একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নাবলীর উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যতক্ষণ না পূর্ণাঙ্গ তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ পাচ্ছে, ততক্ষণ এই সাবেক অধিনায়কের ক্রিকেট ভবিষ্যৎ এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে বন্দি হয়ে রইল।

