দিল্লিতে বিক্ষোভের আগে রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে আটক

ভারতের রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকেকে গত শনিবার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভে যোগ দিতে তিনি নয়াদিল্লি যাচ্ছিলেন। রাজধানীতে উড়োজাহাজ অবতরণ করার পরপরই পুলিশ তাঁকে আটক করে। তাঁর সঙ্গে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) দুই জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। গতকাল নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগে আটক হন দিপকে।

৩১ বছর বয়সী দিপকে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে সম্বোধন করলে তার প্রতিবাদে তিনি পোস্ট দেন, ‘হোয়াট ইফ অল দ্য ককরোচেস কাম টুগেদার?’ (সব তেলাপোকা যদি এক হয়, তবে কী হবে?)। এই ছয় শব্দের পোস্টটি থেকেই জন্ম নেয় সিজেপি, যা বর্তমান ভারতের রাজনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরিকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ৩১ বছর বয়সী দিপকে ভারতের বর্ণব্যবস্থায় নিচু অবস্থানে থাকা দলিত পরিবারে জন্মেছেন।

আন্দোলন ও ঘটনার প্রেক্ষাপট

  • ভোটার তালিকা বিতর্ক: সমালোচকদের দাবি, ভোটার তালিকার খসড়া সংশোধনের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
  • উড়োজাহাজে দিপকের বার্তা: গ্রেপ্তারের সময় দিপকে পুলিশকে বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার হতে এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন। আমি আপনাদের ভয় পাই না।’
  • পুলিশের প্রতিক্রিয়া: টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে এক কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, দিপকেকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, বরং সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের দাবি, ১৩ কোটির এই সংখ্যাটি জাপানের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি হলেও এসব নাম চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়নি। খসড়া সংশোধনের সময় এগুলো কেবল চিহ্নিত হয়েছে এবং বাদ পড়া ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। তবে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নথিপত্রে দেখা গেছে, জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকর্মী ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ভোটার তালিকা নিয়ে কারসাজির অভিযোগ ঘিরে এ বিক্ষোভ ডাকা হয়েছিল।

এর আগে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলনের সময়ও সিজেপি বড় ভূমিকা রাখে। ওই ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তীব্র আন্দোলনের মুখে গত ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার ক্ষেত্রে একটি বিরল ঘটনা। পরে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সেই আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। দিপকেসহ সিজেপির শীর্ষ নেতারা আটকের পর আন্দোলনের নেতৃত্বে আসা কে এই অজিঙ্ক শিন্ডে। শুরুতে এটি ছিল অনলাইনভিত্তিক আন্দোলন। এই আন্দোলন ভারতজুড়ে বড় বড় বিক্ষোভের আয়োজন করেছে। টানা ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা থেকে এমন পদত্যাগ বিরল ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী দিপকে জানিয়েছেন, তিনি এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। ভিডিও বার্তায় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন, ‘দেশের তরুণদের ও জনগণকে এত ভয় কেন?’ দিপকে গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনের আদর্শে সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বর্তমানে দিল্লিজুড়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। জনসমাগম রুখতে পরিবহন ব্যবস্থা ও টেলিযোগাযোগ সংযোগেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন মূলত সরকারি স্কুলের মান উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের দাবিকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছে। দিপকে এবং তাঁর সহযোগীদের আটক করা হলেও সিজেপি তাদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।