বরিশাল অঞ্চলে আবহাওয়ার বিচিত্র আচরণ জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি কৃষি সেক্টরে নানামুখী বিরূপ প্রভাব ফেলে চলেছে। বর্ষা মৌসুম আসন্ন হলেও গত বছরের শেষভাগ থেকে শুরু করে সদ্যসমাপ্ত মে মাস পর্যন্ত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা সাধারণ মানুষের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়েছে এবং কৃষি খাতেও প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রকোপও।
সদ্যসমাপ্ত মে মাসে বরিশালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৫.৩% কম ছিল। এর ঠিক আগের মাস, এপ্রিলে বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের ১৬৯ ভাগ বেশি। তবে মার্চ মাসে বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের ৪৯% কম। অপরদিকে, বৃষ্টিপাতের এই টালমাটাল অবস্থার রেশ ধরে তাপমাত্রার পারদও লাগাতার স্বাভাবিকের ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওপরে থাকায় জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রকৃতি-নির্ভর কৃষি সেক্টরে নতুন নতুন দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করছে। এই বিষয়টি নিয়ে কৃষিবিদরাও উদ্বিগ্ন।
কৃষি খাতে ব্যাপক প্রভাব
গত বছর ১ নভেম্বরের পর টানা ১২৭ দিন শেষে গত ৯ মার্চ বরিশালে মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির দেখা মিললেও পুরো মার্চ মাস জুড়েই বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ছিল ৪৯%। অথচ এপ্রিল মাসজুড়ে স্বাভাবিকের ১৬৯ ভাগ বেশি বৃষ্টিপাত বরিশালের কৃষি ব্যবস্থাকে লন্ডভন্ড করে দেয়। বরিশাল কৃষি অঞ্চলের মাঠে বোরো ধানসহ ৫ লাখ ৫৭ হাজার হেক্টরের বিভিন্ন ধরনের ফসলের মধ্যে ১ লাখ ১১ হাজার হেক্টর জমির ফসল অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে আক্রান্ত হওয়ায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার ফসলহানি ঘটে। কিন্তু মে মাসে স্বাভাবিক ২৩৫ মিলিমিটারের স্থলে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১২৯ মিলিমিটার, যা ছিল স্বাভাবিকের ৪৫.৩% কম।
বৃষ্টিপাতের ঘাটতির ফলে এবার বরিশাল কৃষি অঞ্চলে আবাদকৃত প্রায় ৪ লাখ হেক্টরে বোরো ধানে অতিরিক্ত সেচ প্রদানে উৎপাদন ব্যয় মণপ্রতি ১২০০ টাকার ওপরে উঠে গেছে। এমনকি বোরো সেচের মধ্যভাগের পরে ডিজেলের মূল্য ১৫ ভাগ বৃদ্ধির ফলে ধানের উৎপাদন ব্যয়ে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৯ ভাগ বোরো ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। উপরন্তু, ১৩ মে এবং ২৬ মে দু’দফায় যথাক্রমে ২৭ মিলিমিটার ও প্রায় ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টির ফলে বোরো ধান কর্তন ও মাড়াইয়েও কিছুটা বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রায় সব বোরো কর্তন সম্পন্ন হলেও এপ্রিলের অতিবৃষ্টিতে শতাধিক কোটি টাকার ধান বিনষ্ট হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে।
জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ও হামের প্রকোপ
এবার বৃষ্টিপাতের নানামুখী আচরণের কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। চলমান হাম সংক্রমণ প্রতিরোধে ইতোমধ্যে টিকাদান কর্মসূচির প্রাথমিক রাউন্ড সম্পন্ন হলেও এ রোগের প্রকোপ কমছে না। একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঘাটতিতে হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। স্বাভাবিক বৃষ্টি ফিরে এলেই হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহল আশাবাদী।
এদিকে, বৃষ্টিপাতের ঘাটতির কারণে এখনো বরিশাল অঞ্চলের প্রধান দানাদার খাদ্য ফসল আমনের বীজতলা তৈরি শুরুই হয়নি। অথচ খরিপ-১ মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে প্রায় ২৪ লাখ টন আমন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
বিলম্বিত বর্ষা ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
এদিকে, আবহাওয়া বিভাগের দীর্ঘমেয়াদী বুলেটিনে চলতি মাসের প্রথমার্ধেই বর্ষা মাথায় করে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বরিশালসহ সারা দেশে বিস্তার লাভ করবে বলে জানানো হয়েছে। যদিও অন্যান্য বছর ২৯ মে পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বরিশালসহ উপকূল অঞ্চলে প্রবেশ করে থাকে। এবার আবহাওয়া বিভাগ জুনের প্রথমার্ধে বর্ষা দেশে প্রবেশ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। ফলে বর্ষা মৌসুম কিছুটা বিলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনাও আভাষ মিলছে। পাশাপাশি, চলতি মাসেও বরিশালসহ সারা দেশে স্বাভাবিকের কিছুটা কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর তার দীর্ঘমেয়াদী বুলেটিনে।
