পাবনায় হামের প্রকোপ বৃদ্ধি, জনবল সংকটে জর্জরিত হাসপাতাল

পাবনা জেনারেল হাসপাতালে হাম এবং এর বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। কোমলমতি শিশুরা হামের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শিশু ওয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় হামে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘ সারি এখন হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের সামনে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত রোগীদের থেকে সুস্থ রোগীদের মধ্যেও দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে।

গত রবিবার (১৪ জুন) হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে আক্রান্ত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। অভিভাবকদের চরম উদাসীনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণে সুস্থ শিশুরা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এর একটি দৃষ্টান্ত হলো, দুই সপ্তাহ আগে পাবনা শহরের বাংলাবাজার এলাকার ৬ বছর বয়সী শিশু রোজা হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাকে দেখতে এসে একই এলাকার ২ বছর বয়সী শিশু সাইফ তার মায়ের সাথে হাসপাতালে আসার আট দিন পর হামে আক্রান্ত হয়। হাসপাতালের শয্যার পাশে মেঝেতে, বারান্দায় হাম রোগী ও তাদের স্বজনদের গাদাগাদি অবস্থা এবং প্রতিদিন রোগীদের দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি পালনে চরম উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সংক্রমণ পরিস্থিতি

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হামকে অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, এর অত্যধিক সংক্রমণ ক্ষমতা থাকায় রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পাবনা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক ডাঃ দুলাল ভৌমিক ইনকিলাবকে জানান, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি অথবা কথা বলার সময় নির্গত ড্রপলেট বা কণার মাধ্যমে এটি বাতাসের সাহায্যে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাবনার হাসপাতাল থেকে শুরু করে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের চেম্বার পর্যন্ত কোথাও স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। এমনকি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেও এ বিষয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি ইনকিলাবকে জানান।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান ও জনবল সংকট

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯ জন হাম রোগী ভর্তি হয়েছেন। গত এক মাসে মোট ২৮১ জন এবং চলতি বছরে এ পর্যন্ত ১১২৬ জন হামে আক্রান্ত রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। শিশু ওয়ার্ডে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের সেবা প্রদানে মাত্র ২ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং ৩ জন তরুণ ইন্টার্ন নার্স দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। শুধু শিশু বিভাগ নয়, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালটি বেশিরভাগ সময়ই প্রায় এক হাজার রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খায়। পাবনা জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল এই ২৫০ শয্যার পাবনা জেনারেল হাসপাতাল। তবে লোকবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং ওষুধের সংকটের কারণে হাসপাতালটির বেশিরভাগ সেবাই সীমিত হয়ে পড়েছে।

জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. জাহিদুল ইসলাম ইনকিলাবকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হাসপাতালে ডাক্তার, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র অভাব রয়েছে। এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের সাধ্যমতো নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

সিভিল সার্জনের পরামর্শ ও পদক্ষেপ

পাবনার সিভিল সার্জন ডাঃ আবুল কালাম আজাদ ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, শিশুর জ্বর অথবা শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে দ্রুত তাকে আইসোলেশন বা আলাদা করে রাখতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাবনায় হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা কম। হামের সংক্রমণ যেন একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে জেলা, উপজেলা এবং থানা পর্যায়ে তাদের প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।