সম্পত্তির বিরোধের জেরে নিজেদের বাবাকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে দুই ছেলে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, মূলত বাবার তিন বিয়ের কারণে প্রথম সংসারের দুই সন্তান সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এস.এম রফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, নিহত মুজিবুর রহমান পেশায় একজন বাবুর্চি ছিলেন এবং তার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল এলাকায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিনটি বিয়ে করেছিলেন। তার প্রথম স্ত্রীর ঘরে দুই ছেলে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রীর ঘরে একটি করে মেয়ে রয়েছে।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ সময়ে মুজিবুর রহমান তার দুই মেয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন এবং নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের পেছনে খরচ করতেন। এই বিষয়টি প্রথম পক্ষের দুই ছেলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। একপর্যায়ে তারা বাবাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেলাল হোসেন তার পরিচিত এক নারীকে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ওই নারী নিয়মিত ফোনে কথা বলে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। তাকে নতুন করে বিয়ে দেওয়ার আশ্বাসসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে ওই নারী নিজের বাসায় ডেকে নেন।
২০২৪ সালের ৭ জুন মুজিবুর রহমান ওই নারীর বাসায় যান। এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি ফাঁদ। সেখানে তাকে আপ্যায়নের সময় কোমল পানীয় বা শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। ওষুধের প্রভাবে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়লে বেলাল এবং তার বড় ভাই আবদুল জলিল ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
পিবিআই আরও জানায়, এরপর মুজিবুর রহমানকে অসুস্থ রোগী হিসেবে পরিচয় দিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে সিআরবি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে তুলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয়। হত্যার জন্য একটি নির্জন স্থান খুঁজতে খুঁজতে তারা হালিশহরের আউটার লিংক রোড এলাকায় পৌঁছায়।
সন্ধ্যার দিকে মাইক্রোবাসের ভেতরেই বেলাল ও জলিল গামছা দিয়ে মুজিবুর রহমানের গলায় পেঁচিয়ে দুই পাশ থেকে টান দেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে তারা মরদেহ রাস্তার পাশের একটি ঝোপে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর মুজিবুর রহমানের মেয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। তদন্তের একপর্যায়ে নিহতের মোবাইল ফোন বেলালের শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার হয়। এই সূত্র ধরে মামলাটি নতুন মোড় নেয়। মামলা দায়েরের পর বেলাল আত্মগোপনে চলে যান এবং দীর্ঘ সময় কক্সবাজার এলাকায় অবস্থান করেন। সম্প্রতি তিনি এলাকায় ফিরে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন এবং ঘটনাস্থল শনাক্ত করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আবদুল জলিলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে আরও জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর হালিশহর এলাকার একই স্থান থেকে পুলিশ একটি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করেছিল। ওই লাশের গলায় থাকা গামছা এবং পরনের পোশাকের বর্ণনা আসামিদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে গেছে। পুলিশ ধারণা করছে, এটিই মুজিবুর রহমানের লাশ। বিষয়টি নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পিবিআই এসপির দাবি, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকেই ছেলে বেলাল হোসেন ও তার সহযোগীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারকৃত বেলাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
