পটুয়াখালীতে প্রায় ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ৫৫টি সেতু ও সাতটি সড়কের কাজ গত ২২ মাস ধরে থমকে আছে। কোথাও সেতুর মূল কাঠামো তৈরি হলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়নি, আবার কোথাও সড়কের সুরকি-বালু ফেলে রেখে দিনের পর দিন কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পালিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছে।
ঠিকাদার পলাতক ও ব্যাংক হিসাব জব্দ
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ২২টি প্যাকেজের অধীনে এসব নির্মাণকাজের মূল ঠিকাদার ছিল পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজের মালিকানাধীন ইফতি-ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড। আওয়ামী লীগের পতনের পর মহিউদ্দিন মহারাজ দেশত্যাগ করলে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। আর্থিক লেনদেনে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় সাব-ঠিকাদারেরা কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
পটুয়াখালীর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হোসেন আলী মীর প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, বিল উত্তোলনসহ বিভিন্ন জটিলতায় পড়ার পর স্থানীয় সাব-ঠিকাদারেরা কাজ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে সাব-ঠিকাদারেরা আদালতে মামলাও করেছেন। এ কারণে ইফতি-ইটিসিএলের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করে পরবর্তী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আদালত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া গেলে ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রকল্পগুলো শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রকল্পের বিস্তারিত ও আর্থিক চিত্র
এলজিইডির পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ (বিডিআইআরডব্লিউএসপি), ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প’ (আইবিআরপি), ‘উপজেলা শহর (পৌরসভা ছাড়া) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ (ইউটিএমআইডিপি) এবং ‘উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম্য সড়কে অনূর্ধ্ব–১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্প’ (ইউএইচবিপি)-এর অধীনে মহিউদ্দিন মহারাজের ইফতি-ইটিসিএল লিমিটেডের নামে মোট ২২টি প্যাকেজে ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল।
এলজিইডির নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পৃথক দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন উপজেলায় কাজের বিস্তারিত চিত্র নিম্নরূপ:
- সদর উপজেলায় ১৯টি গার্ডার ও আয়রন সেতু, বক্স কালভার্ট এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১৬ কোটি ২৫ লাখ ৪ হাজার টাকা এবং ৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে ২১ কোটি ৩৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
- গলাচিপায় ৭টি গার্ডার ও আয়রন সেতু নির্মাণে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে ৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল।
- কলাপাড়ায় পাঁচটি সেতু নির্মাণে ৭ কোটি ২৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়।
- মির্জাগঞ্জে ২০টি সেতু নির্মাণে ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল।
- রাঙ্গাবালীতে চারটি সেতু নির্মাণে ৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং দুমকি উপজেলায় ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ৫৫টি সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং সাতটি সড়কের উন্নয়নকাজ করার কথা ছিল। প্রতি অর্থবছরের মধ্যেই কাজ শেষ করার কথা থাকলেও, তা না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সড়ক উন্নয়নের কাজ ২০২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
অচলাবস্থার কারণ ও সময়ক্রম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মহিউদ্দিন মহারাজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে নির্মাণকাজ থমকে যায়। এরপর ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) মহিউদ্দিন ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। আর্থিক লেনদেনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সাব-ঠিকাদারেরা কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে এলজিইডি থেকে কয়েক দফা চিঠি চালাচালি করা হলেও কোনো সমাধান আসেনি। এছাড়া, কয়েকজন সাব-ঠিকাদার রাজনৈতিক কারণে এলাকায় আসতে না পারায় তাঁদের কাজও বন্ধ রয়েছে।
কাজের অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থা
এলজিইডির নথি অনুযায়ী, ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ার আগে সাতটি সড়ক উন্নয়নকাজের ভৌত অগ্রগতি গড়ে ৫৬ শতাংশ ছিল। এর মধ্যে একটিতে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং একটিতে সর্বনিম্ন ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। বাকি কাজগুলোর অগ্রগতি ছিল ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, সেতু নির্মাণকাজের গড় অগ্রগতি ছিল ৭৭ শতাংশ। কিছু স্থানে সেতু নির্মাণের কাজ শতভাগ শেষ হলেও, গলাচিপায় সর্বনিম্ন ৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে। অন্যান্য কাজের অগ্রগতি ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে ছিল।
তবে কলাপাড়া, গলাচিপা, সদর ও রাঙ্গাবালী উপজেলার বেশ কয়েকটি প্যাকেজের মূল সেতুর কাঠামো পুরোপুরি নির্মাণ হয়ে গেলেও সংযোগ সড়কের কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে প্রায় শেষ হওয়া সেতুগুলোও বর্তমানে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, যা স্থানীয়দের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাব-ঠিকাদারের বক্তব্য
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হোসেন আলী মীর জানান, তিনি পটুয়াখালীতে যোগদানের আগেই এই প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রকল্পগুলোর সময় বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে বিগত সরকারের পতনের পর ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
এ বিষয়ে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইফতি-ইটিসিএল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজ নেওয়া সাব-ঠিকাদার আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি ছয় থেকে সাতটি কাজ করছিলেন এবং বাকিগুলো অন্য ঠিকাদারেরা করছিলেন। মূল ঠিকাদার মহিউদ্দিন মহারাজ দেশত্যাগ করলে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়, যার ফলে এলজিইডির সঙ্গে তাঁদের লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।
আবুল কালাম আজাদের দাবি, ইফতি-ইটিসিএলের কারও সঙ্গে বর্তমানে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করতে তিনিসহ কয়েকজন সাব-ঠিকাদার আদালতে মামলা করেছেন, কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাননি। তাঁরা এলজিইডির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং জটিলতা কাটলে আবার কাজ শুরু করা হবে বলে আশা করছেন।
জনগণের দুর্ভোগ
গত ১০ ও ১৫ মে সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের সিপাইবাড়ি-সংলগ্ন খালে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের আয়রন সেতুর উপরিভাগের কাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সংযোগ সড়কসহ আনুষঙ্গিক কাজ এখনো বাকি। সদর ও মির্জাগঞ্জে কয়েকটি সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, সড়ক উন্নয়নের কাজের ক্ষেত্রে কোথাও শুধু ইটের খোয়া ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও মাটি কাটা হয়েছে। আবার কোনো কোনো সড়ক প্রশস্ত করতে দুই পাশের মাটি তুলে গর্ত করা হয়েছে। গত এপ্রিলের শেষ দিকে হওয়া এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে এসব সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। গর্ত ও খানাখন্দে ভরা এসব সড়কে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, মানুষের হাঁটাচলাও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল জব্বার মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে কাজ বন্ধ। ঠিকাদারের লোকজন সেতুটি দেখতেও আসেননি। তিনি আরও বলেন, সংযোগ সড়ক না থাকায় তাঁরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না এবং যানবাহন চলাচলও বন্ধ আছে।
