শাহজালাল থার্ড টার্মিনাল: চালু না হতেই ঋণের বোঝা

শাহজালাল থার্ড টার্মিনাল: চালু না হতেই ঋণের বোঝা

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজ ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। প্রায় দেড় বছর আগেই এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনালটি চালুর চেষ্টা করছে। তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এই সময়ের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনা চুক্তি এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় ২০২৭ সালের শেষ বা ২০২৮ সালের আগে এর পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু না হলে এই মেগা প্রকল্পটি দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তন না এনে বরং একটি বিশাল বোঝায় পরিণত হবে।

দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ হলেও এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনো শুরু করা যায়নি। অথচ টার্মিনালটি চালু হওয়ার আগেই জাপানের জাইকা থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় চলে এসেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান দৈনিক যুগান্তরকে জানিয়েছেন যে, প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার জাপানি ঋণের বিপরীতে চলতি জুন মাসেই ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং আগামী ডিসেম্বরে আরও ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এই পরিমাণ বেবিচকের এক বছরের উদ্বৃত্ত আয়ের প্রায় সমান। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে রাজস্ব আয় নিশ্চিত করা না গেলে ২২ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝায় পরিণত হবে।

ঋণের বিস্তারিত ও পরিশোধের চাপ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে মোট ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ঋণ হিসেবে ১৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকা প্রদান করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, এই ঋণের প্রথম কিস্তি চলতি বছরের জুনে এবং দ্বিতীয় কিস্তি আগামী ডিসেম্বরে পরিশোধ করতে হবে। ২০৫৬ সাল পর্যন্ত এই কিস্তি পরিশোধের ধারা অব্যাহত থাকবে। যদিও ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া প্রায় দেড় বছর আগেই শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু টার্মিনাল চালু না হওয়ায় বেবিচক জাইকার কাছ থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করে নেয়। তবে সময় বাড়ানোর পরও টার্মিনালটি চালু করা তো দূরের কথা, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ হস্তান্তর ও বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি।

বিলম্বের কারণ ও আর্থিক ক্ষতি

প্রকল্প বিলম্বের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও চালুকরণের বিষয়ে জাপানের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। একই সাথে, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আরও বাড়ানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও দৃঢ়তার অভাব ছিল। যারা ঋণ ও প্রকল্প সংক্রান্ত আলোচনায় জড়িত ছিলেন, তাদের এই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত ছিল যে, প্রকল্প বাস্তবায়নে যত দেরি হবে, ঋণ পরিশোধের চাপও তত বৃদ্ধি পাবে। এটিকে নিছক গাফিলতি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

যদি পরিচালনাসংক্রান্ত চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষর না হয়, তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও অপারেটরের প্রস্তুতি, জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় মোবিলাইজেশন সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগবে। ফলস্বরূপ, যত দেরি হবে, প্রকল্পের অর্থনৈতিক চাপও তত বাড়বে। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার সম্পূর্ণ দায়ভার বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল বিনিয়োগে নির্মিত মেগাপ্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে হলে যাত্রী ও কার্গো উভয় খাতেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অপরিহার্য। অথচ নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ হওয়া সত্ত্বেও পরিচালনা ব্যবস্থা ও রাজস্ব ভাগাভাগি সংক্রান্ত বিষয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দায়বদ্ধতা

এটি স্পষ্ট যে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্বলতার কারণেই প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের দক্ষতা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল, তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি। এর ফলস্বরূপ টার্মিনালটি সময়মতো চালু করা যায়নি, উল্টো এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এটি অনেকটা হাতি কিনে তাকে কাজে না লাগিয়ে শুধু পুষে রাখার মতো, যেখানে কেবল খরচই হয়, কোনো লাভ হয় না। বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ক্ষেত্রেও যেন একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অথচ সময়মতো চালু হলে এটি এতদিনে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁসে’ পরিণত হতে পারত। বিশেষজ্ঞরা এই বিলম্ব এবং গাফিলতির জন্য সংশ্লিষ্টদের দায়ী করেছেন।

এই বিলম্বের কারণ এবং টার্মিনালটি চালু হওয়ার আগেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের বোঝা কেন চাপল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে হবে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আয় ছাড়া দায় পরিশোধ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাসিনার সরকারের আমল থেকেই বলা হচ্ছে যে, এই টার্মিনাল দ্রুত চালু হবে এবং সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। বরং এর মধ্যে চালু করা নিয়ে নতুন নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, এই জটিলতা নিরসন এবং চালু করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগবে। এর ফলে রাষ্ট্রের যে আর্থিক ক্ষতি হবে, তার দায়ভার কে নেবে? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ এই ক্ষতির দায় এড়াতে পারে না।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কোনো আয় ছাড়া ঋণের দায় পরিশোধ অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলবে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই আর্থিক দায় থেকে মুক্তি পেতে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কেবল ‘গালগল্প’ করে আর লাভ নেই; উদ্ভূত সমস্যাগুলো নিরসন করে টার্মিনালটি দ্রুত চালু করতে হবে। একই সাথে, এটিকে লাভজনক করতে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোকে আকৃষ্ট করা, ট্রানজিট যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি, কার্গো ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক স্থানগুলোর দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।