মানবজাতির অর্থনৈতিক জীবনকে স্থিতিশীল ও সুষম করার লক্ষ্যে ইসলাম বেশ কিছু মৌলিক নীতিমালা তৈরি করেছে। এসব নীতি যথাযথভাবে পালন করলে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে আসবে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। ইসলামি অর্থব্যবস্থার সেই মৌলিক পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানে তুলে ধরা হলো।
সুদ অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। এটি সম্পদকে কেবল ধনীদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখে এবং দরিদ্রদের ঋণের বোঝার নিচে পিষ্ট করে। এর ফলে সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমান্বয়ে বড় হয় এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে আল্লাহ তাআলা সুদকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)।
ঘুষ সমাজ ও অর্থনীতির জন্য একটি ভয়াবহ ব্যাধি। এটি মেধার পরিবর্তে অন্যায় সুবিধাকে প্রশ্রয় দেয়, দুর্নীতি বাড়ায় এবং সম্পদের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয় এবং বৈষম্য বাড়তে থাকে। ইসলাম এ পথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বিচারিক কাজে ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারী উভয়ের ওপরই অভিশাপ দিয়েছেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৬)।
জুয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির আরেকটি মাধ্যম। এতে সম্পদ অর্জিত হয় সম্পূর্ণ ভাগ্যনির্ভর উপায়ে, কোনো উৎপাদনশীল শ্রম বা বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে নয়। এর ফলে কেউ হঠাৎ বিপুল বিত্তের মালিক হয়, আবার কেউ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। জুয়া নিম্ন আয়ের মানুষকে দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখালেও শেষ পর্যন্ত তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। সম্পদ গুটি কয়েক মানুষের হাতে জমা হওয়ার ফলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তীব্র হয়। ইসলাম জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা নিষিদ্ধ করেছে (সুরা মায়িদাহ, আয়াত: ৯০)।
ব্যবসায়ীরা যখন কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুত করে রাখেন, তখন বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায় এবং মজুতদাররা অতিরিক্ত মুনাফা হাসিল করে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে। হাদিস শরিফে এই কাজের কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুত করে রাখে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দেবেন (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৫৫)।
অপ্রয়োজনীয় খাতে সম্পদের অপচয় করলে তা সমাজের দরিদ্র ও অভাবী মানুষের কাজে আসে না। এর ফলে সম্পদের সুষম বণ্টন বাধাগ্রস্ত হয় এবং বৈষম্য সৃষ্টি হয়। পবিত্র কোরআনে অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)। এই পাঁচটি বিধান যথাযথভাবে পালন করা হলে সমাজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে এবং একটি কল্যাণমুখী সমাজ গঠিত হবে।

