বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের দৈনন্দিন কাজের একটি বড় অংশ সহজ করে দিয়েছে। ডেটা সাজানো, খসড়া লেখা, কোড করা বা ডিজাইন তৈরির মতো যে কাজগুলোতে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় হতো, এখন তা খুব অল্প সময়েই সম্পন্ন হচ্ছে। এর ফলে অফিসে সারাক্ষণ ‘ব্যস্ত’ দেখানোর প্রচলিত সংস্কৃতিও অনেক ক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে পড়ছে। তাই মূল প্রশ্নটি এখন এআই ব্যবহার করা বা না করা নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের যে সময় বেঁচে যাচ্ছে, সেই বাড়তি সময় আমরা কীভাবে কাজে লাগাচ্ছি সেটিই আসল বিবেচ্য বিষয়।
ইসলামি ঐতিহ্যে কাজের দুটি ভিন্ন দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো ‘আমল’ বা সরাসরি কোনো কাজ সম্পাদন করা, আর দ্বিতীয়টি হলো ‘তাদাব্বুর’, যার অর্থ কাজের পেছনের চিন্তা, পরিকল্পনা এবং দূরদর্শিতা। এআই আমাদের আমলের গতি অনেকগুণ বাড়িয়ে দিলেও গভীর চিন্তা, সঠিক নিয়ত এবং বিচক্ষণতার মতো মানবিক গুণাবলিগুলো আমাদেরই বজায় রাখতে হয়। এআইয়ের যুগে বরং তাদাব্বুরের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কারণ, এআই একটি গুণক হিসেবে কাজ করে; আমাদের নিয়ত ভালো বা মন্দ যা-ই হোক, প্রযুক্তি তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই কাজের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ত স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই তাদাব্বুর বা গভীর চিন্তার শক্তি বৃদ্ধির জন্য ইসলামি ঐতিহ্যে পাঁচটি সহজ অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, নিয়ত ঠিক রাখা। যেকোনো কাজ শুরুর আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত এটি কেন করা হচ্ছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, কাজের ফলাফল মূলত নিয়তের ওপরই নির্ভরশীল (সহিহ বুখারি, হাদিস ১)। দ্বিতীয়ত, একা বসে গভীর চিন্তা করা বা তাফাক্কুর। কোনো জটিল বিষয় সামনে এলে প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী সৃষ্টির গভীরে চিন্তা করা উচিত (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯০-১৯১)। মানুষের সেরা চিন্তাগুলো সাধারণত ডিজিটাল স্ক্রিনের বাইরে একাকী মুহূর্তেই আসে।
তৃতীয় অভ্যাসটি হলো মানুষের পরামর্শ নেওয়া বা মশওয়ারা। নবীজি (সা.) যুদ্ধের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন (সুরা আশ-শুরা, আয়াত ৩৮)। এআই হয়তো পরিসংখ্যান দিতে পারে, কিন্তু প্রাজ্ঞ মানুষ পরিস্থিতির গভীরে গিয়ে সঠিক পথ দেখাতে পারেন। চতুর্থত, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা বা ইস্তিখারা। কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পর নামাজে তা আল্লাহর ওপর সোপর্দ করার মাধ্যমে এটিই স্বীকৃতি দেওয়া হয় যে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের জ্ঞান সীমিত (সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৬২)। সবশেষে, তাড়াহুড়া না করা বা আনাত। হাদিসে ধীরস্থির থাকাকে আল্লাহর প্রিয় গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল বির)। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ই-মেইল লিখে তা এক রাত রেখে পরদিন নতুন চোখে যাচাই করা এই ধীরস্থির অভ্যাসেরই একটি ছোট উদাহরণ।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষ যখনই কোনো প্রযুক্তির সাহায্যে সময় বাঁচিয়েছে, সে সেই সময়টিকে আরও বেশি কাজের চাপ নেওয়ার কাজে ব্যয় করেছে। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য এই বেঁচে যাওয়া সময়টি একটি অপ্রত্যাশিত গনিমত বা বিশেষ প্রাপ্তি, যা সমাজ ও মানুষের সেবায় ব্যয় করা উচিত (সুরা আনফাল, আয়াত ৪১)। এর অর্থ এই নয় যে সব সময় গম্ভীর কিছু করতে হবে; পরিবারের সাথে সময় কাটানো, হাঁটা বা মসজিদে গিয়ে শান্ত মনে নামাজ পড়াও এই সময়ের সুন্দর ব্যবহার। কোরআনে সময়কে কেবল বাড়ানোর মতো কোনো মুদ্রা বলা হয়নি, বরং একে এমন একটি সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যা কিয়ামতের দিন আমলনামার পাল্লা ভারী করবে (সুরা কারিয়াহ, আয়াত ৬-৯)। এআই আমাদের কাজের গতি বদলে দিলেও, এই বেঁচে যাওয়া সময় যে একটি আমানত, তার হিসাব একদিন আমাদের দিতেই হবে।

