বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কি আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে

শিশুটি মাটিতে বসে খেলছিল, তার হাতভর্তি কাদা এবং পোশাকজুড়ে ধুলাবালি লেগে ছিল। দূর থেকে দৃশ্যটি দেখেই মা দ্রুত ছুটে এসে বললেন, ওখানে বসো না, জীবাণু আছে। কথাটি শেষ করার আগেই তিনি শিশুকে টেনে তুলে হাত ধোয়ার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। দৃশ্যটি আমাদের সবার কাছেই অত্যন্ত পরিচিত। শৈশব থেকেই আমরা শিখে এসেছি যে, জীবাণু মানেই শত্রু এবং জীবাণু মানেই রোগব্যাধি। তাই যতটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক। তবে পরিস্থিতি কি আসলেই এমন? যদি এমন হয় যে, জীবাণুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল যুদ্ধের নয়? আরও অদ্ভুত শোনালেও, কিছু জীবাণুর অনুপস্থিতিই হয়তো আমাদের অসুস্থ করে তোলার জন্য দায়ী। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা ঠিক এই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছেন।

একসময় ধারণা করা হতো, মানুষের শরীর ও অণুজীব দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ। কিন্তু বর্তমানে আমরা জানি, আমাদের শরীরের ভেতরে ও বাইরে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকসহ বিভিন্ন অণুজীব বসবাস করে, বিশেষ করে অন্ত্রে। এদের সম্মিলিতভাবে মাইক্রোবায়োম বলা হয়। মানবদেহে বসবাসকারী এই অণুজীবদের অধিকাংশই শত্রু নয়; বরং তারা খাবার হজমে সহায়তা করে, প্রয়োজনীয় কিছু ভিটামিন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে এবং আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার সঙ্গে একটি জটিল ভারসাম্য বজায় রেখে চলে।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে: আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কীভাবে বুঝতে শেখে কোনটি বন্ধু আর কোনটি শত্রু? বিষয়টি বোঝার জন্য একটি দেশের সীমান্তে মোতায়েন হাজারো সৈন্যের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তাদের দায়িত্ব হলো শত্রুকে শনাক্ত করা। কিন্তু যদি তারা কখনো শত্রু ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য করতে না শেখে, তাহলে কী ঘটবে? রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই হতে পারে। জন্মের পর থেকেই আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা চারপাশের পৃথিবীকে চিনতে শেখে। বিভিন্ন অণুজীবের সংস্পর্শে এসে সে ধীরে ধীরে কোনটি বিপজ্জনক আর কোনটি নিরীহ, তা আয়ত্ত করে। অনেক গবেষকের মতে, এই শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় মাইক্রোবায়োম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ মহামারিবিদ ডেভিড স্ট্র্যাচান একটি পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে কিছু বিশেষ অ্যালার্জির হার তুলনামূলকভাবে কম। তাঁর ধারণা ছিল, শৈশবে বেশি জীবাণুর সংস্পর্শে আসা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশে ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে এই ধারণাটি হাইজিন হাইপোথিসিস বা পরিচ্ছন্নতা তত্ত্ব নামে পরিচিতি লাভ করে। এর মানে অবশ্য এই নয় যে নোংরা পরিবেশে থাকা স্বাস্থ্যকর বা হাত ধোয়া বন্ধ করে দেওয়া উচিত। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিষয়টি অনেক বেশি সূক্ষ্ম।

মূল সমস্যা পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং আধুনিক জীবনের অত্যন্ত জীবাণুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ কি আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রশিক্ষণে কোনো বাধা সৃষ্টি করছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা অ্যালার্জি, হাঁপানি ও অটোইমিউন রোগের দিকে আলোকপাত করছেন। অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত নিজের শরীরকেই আক্রমণ করে বসে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস ও ক্রোনস ডিজিজ এ ধরনের রোগের উদাহরণ।

যদিও এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও মাইক্রোবায়োমের সমন্বয়েই এই রোগগুলোর ঝুঁকি তৈরি হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে মাইক্রোবায়োম ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য কমে গেলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে এখনো সতর্ক। তাঁদের মতে, একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে মানেই সেটিই রোগ সৃষ্টির একমাত্র কারণ, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।

তবুও একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, মানুষ ও অণুজীবের সম্পর্ক শুধু রোগ বা সংক্রমণের গল্প নয়, এটি সহাবস্থানেরও একটি দীর্ঘ ইতিহাস। লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের পথে মানুষ ও অণুজীব একসঙ্গে পথ চলেছে। সেই দীর্ঘ সম্পর্কের প্রভাব আজও আমাদের শরীরে কাজ করছে। তাই পরবর্তী সময়ে কোনো শিশুকে মাটিতে খেলতে দেখলে তাকে শুধু জীবাণুর ঝুঁকির চোখে দেখবেন না। অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, তবে একই সঙ্গে এটি মনে রাখা জরুরি যে পৃথিবীর সব জীবাণুই আমাদের শত্রু নয়।