বাংলাদেশে প্রতিবছর বিশাল সংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু শিক্ষিত বেকারত্বের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নীতি কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক তার মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি বর্তমান সরকারের কারিগরি শিক্ষানীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
অধ্যাপক রিদওয়ানুল হকের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। একে অর্থনৈতিক ভাষায় জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়, তাই তরুণদের দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে এটি ভবিষ্যতে আশীর্বাদের বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে অনেক শিক্ষিত তরুণ উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না, আবার শিল্পের চাহিদামতো দক্ষ কর্মীও মিলছে না—এই দক্ষতার অমিলই বড় সমস্যা।
কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার বিকল্প হিসেবে না দেখে আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, জার্মানি বা জাপানের মতো দেশগুলো দক্ষ জনশক্তির ওপর ভিত্তি করেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রধানমন্ত্রী কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ড. মাহদী আমিনের অংশগ্রহণে এই নীতি প্রণয়নের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষাকে কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা।
নতুন এই নীতির সবচেয়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন হলো দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর। এখন শিক্ষা আর সাধারণ ও কারিগরি—এই দুই ভাগে বিভক্ত নয়। একজন শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে দক্ষতা অর্জন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে আবার উচ্চশিক্ষায় ফিরে আসার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া শিল্প খাতকে এখন শিক্ষাব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে পাঠ্যক্রম আধুনিক ও বাস্তবমুখী হয়।
তরুণদের বেকারত্বের সমস্যার সমাধানে অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন: শিক্ষা ও শিল্প খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব, ব্যবহারিক বা অন-দ্য-জব ট্রেনিং নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা ও নেতৃত্ব গুণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিশেষে, তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন যে কেবল ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং বিদেশি ভাষা শেখা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিজেকে কেবল চাকরিপ্রার্থী না ভেবে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়।
