কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে—বিশ্বজুড়ে যখন এই প্রশ্ন নিয়ে জোর আলোচনা চলছে, তখন ভিন্ন সুর শোনা গেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতের অন্যতম পথিকৃৎ ইয়ান লেকুনের কণ্ঠে। তাঁর মতে, প্রচলিত এআই প্রযুক্তি এখনো বুদ্ধিমত্তার সেই কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাস্তব জগতকে বোঝার সক্ষমতায় আমাদের তৈরি রোবটগুলো একটি ইঁদুরের ধারেকাছেও নেই।
মেটার প্রধান এআই-বিজ্ঞানী হিসেবে দীর্ঘ এক দশক দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালে ইয়ান লেকুন ‘অ্যাডভান্সড মেশিন ইন্টেলিজেন্স ল্যাবস’ বা এএমআই ল্যাবস প্রতিষ্ঠা করেন। চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা জেমিনাইয়ের মতো বর্তমান এআই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠাই তাঁর লক্ষ্য। ফ্রান্সের ভিভাটেকে আয়োজিত প্রযুক্তি সম্মেলনে তিনি বলেন, বর্তমান এআই মডেলগুলো মানবস্তরের বা প্রাণীর মতো বুদ্ধিমত্তার পথে নেই, কারণ এগুলো বাস্তব বিশ্বের তথ্য নিয়ে কাজ করতে পারে না।
বিনিয়োগকারীরাও লেকুনের এই নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনা দেখছেন। এ বছরই এএমআই ল্যাবস ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূলধন সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে, যার মধ্যে এনভিডিয়া এবং জেফ বেজোসের ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবস্থাপনা তহবিলও অন্তর্ভুক্ত। এটি ইউরোপের স্টার্টআপগুলোর জন্য অন্যতম বড় তহবিল সংগ্রহের ঘটনা। তবে ২০১৮ সালে ডেভিড হা এবং ইয়ুর্গেন শ্মিডহুবারের প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র এই কাজে গবেষক দলকে অনুপ্রাণিত করেছে। গবেষক দলের ধারণা ছিল, মেশিন লার্নিং ও কম্পিউটারের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এআই জগতের একটি ‘মানসিক সিমুলেশন’ থেকে কাজ করতে শিখতে পারে।
লেকুনের মতে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (এলএলএম) কোডিং বা গণিতের মতো নির্দিষ্ট ও অনুমানযোগ্য কাজে দক্ষ হলেও এদের কোনো মৌলিক বোধগম্যতা নেই। তিনি একটি কলমের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন যে, একটি এলএলএম পরিসংখ্যানগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কলমটি কোন দিকে পড়বে তা অনুমান করার চেষ্টা করলেও পদার্থবিজ্ঞানের বাস্তব নিয়মগুলো বুঝতে পারে না। তাঁর কোম্পানি ‘জয়েন্ট এমব্যাডিং প্রেডিক্টিভ আর্কিটেকচার’ বা জেপিএ সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে, যা বাস্তব জগতের একটি বিমূর্ত রূপ তৈরি করে কাজের ফলাফল মূল্যায়ন করতে সক্ষম।
রোবোটিকস শিল্পের জন্য বর্তমান এলএলএম মডেলগুলোকে অকার্যকর উল্লেখ করে লেকুন বলেন, রোবটকে দিয়ে ঘরের সাধারণ কাজ করানো এখনো ব্যয়বহুল ও কঠিন। একই সাথে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইঙ্গমার পোসনারও জানান যে, আগামী দশকটি হবে ব্যাখ্যামূলক প্রযুক্তির, যেখানে ‘ওয়ার্ল্ড মডেল’ বা মানসিক সিমুলেশন নিয়ে কাজ করা জরুরি। ২০১৮ সালের পর থেকে এই ধারণা ওয়ার্ল্ড মডেলের গবেষণায় জোয়ার এনেছে। প্রয়োজনে যখন দরকার হবে, তখন এআই সেই জ্ঞান খুঁজে বের করবে, মিলিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন করবে। তবে তেমন প্রযুক্তি তৈরি হতে কত সময় লাগবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন বলে মনে করেন পোসনার। পোসনার আরও বলেন, ২০১৭ বা ২০১৮ সালে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করতেন চ্যাটজিপিটির মতো কিছু আসতে কত সময় লাগবে, তবে তাঁরা বলতেন, কয়েক দশক। কিন্তু তার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসে। গুগলের মালিকানাধীন ডিপমাইন্ড তাদের ‘জিনি’ মডেল এবং লন্ডনের প্রতিষ্ঠান ওয়েভ তাদের ‘গাইয়া’ সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। এদিকে এআই বিশেষজ্ঞ ফেই-ফেই লি ২০২৩ সালে সানফ্রান্সিসকোয় ‘ওয়ার্ল্ড ল্যাবস’ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী লেকুন জানান, এএমআই ল্যাবস তাদের মডেলটি আরও নিখুঁত করছে এবং আগামী বছর থেকে শিল্পকারখানায় এটি ব্যবহারের আশা করছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে সাধারণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিস্টেম তৈরি হবে যা মানুষের নির্দেশ মেনে কাজ করবে, যেখানে মানুষই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে মূল ভূমিকা পালন করবে।

