টানা কয়েকদিনের বর্ষণে জামালপুর জেলা শহর আবারও অচল হয়ে পড়েছে। শহরের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা এখন হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির নিচে। সড়ক, অলিগলি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর বর্ষাকালে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটলেও স্থায়ী সমাধানের কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। শহরবাসীর মনে এখন প্রশ্ন জেগেছে, এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাকি বছরের পর বছর ধরে চলা খাল দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল।
শহরের গেটপাড়, পাঁচরাস্তা মোড়, শেখেরভিটা, বিজয় চত্বর, চামড়াগুদাম, কাচারীপাড়া, ফিশারিপাড়া, বনপাড়া ও পশ্চিম নয়াপাড়াসহ প্রায় অর্ধশতাধিক এলাকায় পানি জমে রয়েছে। অনেক সড়কে যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, আর রিকশা ও অটোরিকশার চলাচলও সীমিত হয়ে পড়েছে। পানি জমে থাকার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং শহরের বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ এখন চরমে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শহরের অধিকাংশ খাল এখন দখল, ভরাট কিংবা সংকুচিত হয়ে গেছে। খালের ওপর ভবন, মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগেও ভারী বৃষ্টির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যেত, কিন্তু এখন সামান্য বৃষ্টিতেই দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। তাদের মতে, শহর পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক জলাধার ও খালের গুরুত্ব উপেক্ষা করায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
শহরবাসীর অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও এর সুফল মিলছে না। অনেক ড্রেন প্রয়োজনের তুলনায় ছোট, সংযোগহীন, আবার অনেকগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে আছে। পরিবেশ আন্দোলনের জামালপুর সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, খাল পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথ উন্মুক্ত রাখা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ছাড়া এ সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহেল কাফি জানান, শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল নকশাতেই ত্রুটি রয়েছে। তার মতে, শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত বংশ খালকে কেন্দ্র করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ড্রেন পশ্চিমমুখী ঢাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া অনেক ড্রেন সড়কের তুলনায় উঁচু হওয়ায় এবং কালভার্টের ঢাকনার কারণে পানি সহজে নামতে পারে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত পনের বছরে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতারা ঠিকাদার হিসেবে কাজ করায় তারা নিজেদের মর্জিমাফিক কাজ করেছেন, যার প্রতিবাদ করার সাহস কেউ পায়নি।
জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌরসভার পদক্ষেপ সম্পর্কে নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, বেশ কয়েকটি টিম মাঠে কাজ করছে এবং পানি নিষ্কাশনের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। পৌরসভার প্রশাসক মৌসুমী খানম বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং কর্মীরা দ্রুত পানি অপসারণের জন্য কাজ করছেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিয়েও কাজ চলমান রয়েছে।
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৪৪আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৪৪

