জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের অভিভাবকদের ফাঁদে ফেলছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। কখনো ডিবি পুলিশ, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অভিনব উপায়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। গত ছয় মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ফেসবুক গ্রুপে অন্তত ৬৬ জন শিক্ষার্থী এমন প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবারও এক শিক্ষার্থী তাঁর পরিবারের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটার কথা উল্লেখ করেছেন।
গত ১৯ জুলাই রাত সাড়ে নয়টায় দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বাসিন্দা আমজাদ আলীর কাছে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে ডিবি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলা হয়, তাঁর ছেলেকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে। এরপর ফোনে কান্নার আওয়াজ শুনিয়ে দাবি করা হয় সেটি তাঁর ছেলের কণ্ঠ। ছেলেকে ছাড়াতে দ্রুত বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হলে আমজাদ আলী বাজারের দিকে রওনা হন। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা যোগাযোগ করে নিশ্চিত হন যে, তাঁর ছেলে শাকিল হোসেন (রসায়ন বিভাগ, ৪৮তম ব্যাচ) বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে নিরাপদেই আছেন। একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ৫৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাসনিম আলমের বাবা। তাসনিম জানান, প্রতারকেরা তাঁর পরিচয় এত নিখুঁতভাবে দিয়েছিল যে তাঁর স্কুলশিক্ষক বাবা প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তবে সচেতনতার কারণে তাঁদের কোনো টাকা খোয়া যায়নি।
শুধু ভয় দেখিয়েই নয়, উপবৃত্তি বা মেধাবৃত্তির টাকা দেওয়ার নাম করে ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও ওটিপি (গোপন পাসওয়ার্ড) হাতিয়ে নিয়েও টাকা চুরি করছে চক্রটি। এই ফাঁদে পড়ে চারুকলা বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আকিবা মোস্তফার পরিবার দুই দফায় ৩৬ হাজার টাকা হারিয়েছে। আকিবা জানান, তাঁর মায়ের ফোনে কল দিয়ে এক ব্যক্তি নিজেকে জাবির শিক্ষক পরিচয় দেন এবং উপবৃত্তির টাকা ব্যাংক হিসাবে ঢুকছে না অজুহাতে অন্য হিসাব নম্বর ও তথ্য চেয়ে টাকা তুলে নেয়। একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাজিয়া আফরিনের পরিবার হারিয়েছে ১০ হাজার টাকা। সাজিয়া জানান, প্রতারক তাঁর নাম, বিভাগ ও বর্ষ সঠিকভাবে বলায় তাঁর বাবা বিশ্বাস করে ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও ওটিপি দিয়ে দেন, যার পরপরই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চলে যায়।
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া আফনানের অভিজ্ঞতা ছিল কিছুটা ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া নথিতে তাঁর বড় বোনের নম্বর দেওয়া ছিল। সেই নম্বরে কল দিয়ে বলা হয়, রেজিস্ট্রার ভবনের ২০৮ নম্বর কক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এবং সরকার পতনের কারণে উপবৃত্তির টাকা দিতে জটিলতা হওয়ায় এটিএম কার্ডের ছবি লাগবে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রেজিস্ট্রার ভবনে ২০৮ নম্বর নামে কোনো কক্ষই নেই।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, তাঁরা ভর্তির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শাখা এবং উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখায় যে তথ্যগুলো জমা দিয়েছিলেন, হুবহু সেই তথ্যগুলোই প্রতারকেরা ব্যবহার করছে। ফলে এই শাখাগুলো থেকেই তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দুই দপ্তরের কর্মকর্তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান বলেন, তাঁদের অফিস থেকে তথ্য ফাঁসের সুযোগ নেই। বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা ওয়েবসাইটে দেওয়া হলেও সেখানে ফোন নম্বর থাকে না। এমনকি কয়েক দিন আগে এই চক্র তাঁকে নিজের ফোনেও কল দিয়েছিল বলে জানান তিনি। সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই মুহূর্তে কোনো উপায় নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা জানান, যেসব নম্বর থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে, তা সংগ্রহ করে পুলিশের সহায়তায় চক্রটিকে শনাক্ত করার বিষয়ে রেজিস্ট্রারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি শিক্ষা শাখাকে অবহিত করেছেন এবং তারা একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে রেজিস্ট্রারকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, যেসব নম্বর থেকে প্রতারণা করা হচ্ছে, সেগুলো শিক্ষা শাখায় জমা দিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আইনি সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান উপাচার্য।

