১৫ জুলাই ঢাবিতে ছাত্রলীগের হামলা ঠেকিয়েছিল ‘অপারেশন হাসবুনাল্লাহ’

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলায় ক্যাম্পাস রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। ছাত্রীদের ওপরও চালানো হয় নৃশংস নির্যাতন। এই হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম তন্বী এবং ছাত্রশিবিরের শাহেদসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। হামলার ভিডিও চিত্র মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ ভেবেছিল এই বর্বরতার মাধ্যমে আন্দোলন দমন করা যাবে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটিই ছিল তাদের পতনের সূচনা।

সেদিন গাজীপুরে ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন শাখার পরামর্শ সভা ও স্টাডি সার্কেল অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা দেন যে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর ফয়সালা হয়ে গেছে, হাসিনার বিদায় নিশ্চিত।’ এরপরই প্রোগ্রাম সমাপ্ত করে তিনি উপস্থিত সদস্যদের দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন।

কেন্দ্রীয় সভাপতির নির্দেশনা পাওয়ার পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ এবং প্রকাশনা সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ ঢাকা মহানগর পূর্বের সভাপতি মোজাফফর হোসেনকে বাছাইকৃত জনশক্তি নিয়ে দ্রুত ক্যাম্পাসে যাওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে মোজাফফর হোসেন মহানগর পূর্বের তৎকালীন সেক্রেটারি আসিফ আব্দুল্লাহকে প্রস্তুতি নেওয়ার দায়িত্ব দেন। অল্প সময়ের মধ্যে চানখাঁরপুল এলাকায় ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার কয়েকশ নেতাকর্মী একত্রিত হন। পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সভাপতি ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে আরেকটি দল তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। একই সময়ে ঢাকা কলেজ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর শাখার সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে অবস্থান নেন।

প্রতিরোধ অভিযান সফল করতে এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতে তৎকালীন ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সভাপতি মোজাফফর হোসেন ‘অপারেশন হাসবুনাল্লাহ’ নামে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপ তৈরি করেন। মাগরিবের আজানের পর সবাইকে নামাজ ও দুই রাকাত নফল নামাজ আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর চানখাঁরপুল এলাকায় অবস্থান নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ছাত্রলীগকে প্রতিহত করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

মোজাফফর হোসেনের নেতৃত্বে শহীদুল্লাহ হলের সামনে ‘অপারেশন হাসবুনাল্লাহ’ শুরু হয়। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করে শিবিরের নেতাকর্মীরা অবরুদ্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। শহীদুল্লাহ হলে পৌঁছে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে ছাত্রলীগকে প্রতিহত করলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরপর আরেকটি বড় দল অমর একুশে হলের দিকে অগ্রসর হয়ে সেখানকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করে।

ছাত্রলীগের হামলা প্রতিহত করার পর শিবিরের নেতাকর্মীরা রাতভর চানখাঁরপুল থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে নজরদারি অব্যাহত রাখেন। এই প্রতিরোধের দৃশ্য পরবর্তীতে ডিবিসি নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে প্রচারিত হয়। পরাজিত ছাত্রলীগ ওই রাতেই বহিরাগত সন্ত্রাসী এনে পুনরায় শহীদুল্লাহ হলের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়, কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে তারা মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। ১৫ জুলাইয়ের এই সফল প্রতিরোধের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে শুরু করে এবং ১৬ জুলাই থেকে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলো থেকে ছাত্রলীগ বিতাড়িত হতে থাকে।