২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মুখে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেই পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য, শীর্ষ নেতৃত্ব, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবং জাতীয় মসজিদের খতিবসহ শাসনকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা একে একে তল্পিতল্পা গুটিয়ে গা-ঢাকা দিলেও বঙ্গভবনের মসনদে থেকে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনার মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। অবশেষে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র গণদাবির মুখে শুক্রবার (২৪ জুলাই) পদত্যাগের মাধ্যমে তার বিতর্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করে নতুন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার।
৫ আগস্টের পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত তার স্ববিরোধী বক্তব্য এবং পতিত শাসনের প্রতি পরোক্ষ অনুরাগের অভিযোগ জনগণের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে তার অপসারণের দাবিটি একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়েদুল হাসানও দেশ ছাড়েন। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই বিপ্লবের পর তিনি গোপন স্থান থেকে হাসিনার পক্ষে বিচারিক ক্যূ করার চেষ্টা করেছিলেন। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ গোয়েন্দা সংস্থার বড় বড় কর্মকর্তারাও ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেন। পালিয়ে যান হাসিনার নিয়োগ করা বায়তুল মোকাররমের খতিব গোপালগঞ্জের রুহুল আমিন, যিনি শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়ে দেশব্যাপী সমালোচিত হয়েছিলেন। জুলাই বিপ্লবের পর হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর আসতে থাকে। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ ও আব্দুল মোমেনসহ মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্যই ভারতে চলে যান।
তবে কয়েকজন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। শেখ হাসিনার লাঠিয়াল বিচারক হিসেবে পরিচিত বিচারক শাসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সিলেট সীমান্ত এলাকায় জনতার হাতে ধরা পড়েন। এছাড়া ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ, ডিএমপির অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, প্রলয় কুমার জোয়ারদ্যার, এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাবিবুর রহমানের মতো পুলিশ, সিভিল ও সামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তারা পালিয়ে ভারতে বা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন।
বেশ কয়েক দিন ধরে চলা রাজনৈতিক গুঞ্জনের মধ্যে শুক্রবার বিকেলে ব্যক্তিগত কারণ ও অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বঙ্গভবনে অবস্থান করা ছিল পুরনো শাসনের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক অবশিষ্টাংশ। তার বিদায়ের মাধ্যমে সেই শাসন-কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। আন্দোলনকারী দলগুলোর মতে, এই পদত্যাগ গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষারই একটি যৌক্তিক পরিণতি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একটি বড় মাইলফলক।

