এআই ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র, বাড়ছে জালিয়াতি ও প্রতারণা

এআই ব্যবহার করে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি: বাড়ছে জালিয়াতি ও প্রতারণা

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকার কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। জরুরি প্রয়োজনে, যেমন পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে, সংশোধনের উপায় না পেয়ে অনেকে দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এসব দালাল দ্রুত সময়ের মধ্যে এনআইডি ঠিক করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা হয় না, ফলে মানুষ হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দালাল চক্র অনলাইন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিভিন্ন টুলস ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ভুয়া এনআইডি তৈরি করছে। কিছু জনপ্রিয় এআই প্ল্যাটফর্মকে সূক্ষ্ম কৌশলে নির্দেশনা দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, নাম, পরিচয় নম্বর এমনকি স্বাক্ষর পর্যন্ত পরিবর্তন করা হচ্ছে।

ডিসমিসল্যাবের গবেষণা ও উদ্বেগজনক তথ্য

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের একটি উদ্যোগ, ডিসমিসল্যাব, সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছে। তাদের যাচাইয়ে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনাই, এক্সএআইয়ের গ্রোক এবং অ্যানথ্রপিকের ক্লড এআই ব্যবহার করে এমন জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জেমিনাই ও গ্রোকের মতো কিছু এআই প্ল্যাটফর্ম কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই নাম, পিতা-মাতার নাম, পরিচয় নম্বর এবং স্বাক্ষর পর্যন্ত পরিবর্তন করে দিচ্ছে। ডিসমিসল্যাব তাদের পরীক্ষার জন্য অনলাইনে প্রাপ্ত একটি বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের নমুনা এবং একটি স্টক ছবি ব্যবহার করে। এরপর কাল্পনিক একজন ব্যক্তির নাম, পিতা-মাতার পরিচয় ও পরিচয় নম্বর দিয়ে তথ্য পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয়, তবে সরাসরি ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি।

ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, সরকারি পরিচয়পত্রে তথ্য পরিবর্তনের অনুরোধে বিভিন্ন এআই প্ল্যাটফর্ম কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা তুলনা করার জন্য চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই, গ্রোক এবং ক্লডকে একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। শব্দচয়ন বা ব্যবহৃত নথির পার্থক্যের কারণে ফলাফলে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কমাতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, চারটি সিস্টেমের নিরাপত্তাব্যবস্থা এক রকম নয়। কিছু প্ল্যাটফর্মে কঠোর বাধা ছিল, কিছুতে আংশিক বাধা, আবার কিছুতে কোনো দৃশ্যমান বাধাই দেখা যায়নি।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে জেমিনাই ও গ্রোক। পরীক্ষায় দেখা গেছে, জেমিনাই শুধু ছবি নয়, নাম, পিতা-মাতার নাম, পরিচয় নম্বর এবং স্বাক্ষর পর্যন্ত পরিবর্তন করে তুলনামূলক বাস্তবসম্মত পরিচয়পত্রের মতো নথি তৈরি করেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো দৃশ্যমান সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়নি। গ্রোকও একাধিক নির্দেশনার পর একই ধরনের পরিবর্তিত পরিচয়পত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে ছবিতে বিকৃতি ও অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।

এআই প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা ও বাস্তব চিত্র

ডিসমিসল্যাব গুগল, এক্সএআই, ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের প্রকাশ্য নীতিমালা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে যে, এই চারটি প্রতিষ্ঠানই এআই ব্যবহার করে জালিয়াতি, প্রতারণা এবং ভুয়া পরিচয় তৈরির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে, জেমিনাই ও গ্রোকের নীতিমালায় এমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই যে, সরকারি পরিচয়পত্র তৈরির অনুরোধ সব ক্ষেত্রে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হবে।

প্রতারণার ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাব খোলা, সিম নিবন্ধন, চাকরি, ভ্রমণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র অপরিহার্য। অনেক সময় পরিচয় যাচাই কেবল নথি দেখেই সম্পন্ন করা হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ভুয়া বা পরিবর্তিত পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও প্রতারণার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তারা আরও উল্লেখ করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এর সঙ্গে নতুন নতুন নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিও সামনে আসছে।

এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট এবং অন্যান্য সরকারি নথির ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত প্রয়োজন। অন্যথায়, প্রতারণার নতুন নতুন পথ তৈরি হতে পারে। ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা সুরক্ষা বা ‘গার্ডরেল’ এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে সিস্টেমগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অনুরোধ বা অপব্যবহারের চেষ্টা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়, আবার শনাক্ত করলেও সব সময় কার্যকরভাবে ঠেকাতে পারে না। এতে পরিচয় জালিয়াতিসহ বিভিন্ন ধরনের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে।”