কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ আবার ধারালো দা দিয়ে চিরে তৈরি করছেন সরু লম্বা ফালি। আবার কেউ কেউ ফালিগুলো নিয়ে বসেছেন হরেক রকমের কুটির শিল্প বুননের কাজে। পরিবারের নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর পর্যন্ত সবার ব্যস্ততা যেন একই সুতোয় গাঁথা। এমনই এক কর্মচঞ্চল দৃশ্য প্রতিদিন চোখে পড়ে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে।
বংশপরম্পরায় বাঁশ শিল্পকে আঁকড়ে ধরেই টিকে আছে রাজাপুর গ্রামের অধিকাংশ পরিবার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বাঁশের তৈরি কুলা, ডালা, চাটাই, চালনি, টুকরি, চাঙ্গা, হাঁস-মুরগির খাঁচা, এবং মাছ ধরা ও সংরক্ষণের বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।
সরেজমিনে রাজাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশের তৈরি কুটির শিল্পের কাজ চলছে। গৃহিণীরা বাড়ির মেঝে কিংবা বারান্দায় কাজ করছেন। পুরুষ কারিগররা দলবেঁধে খোশগল্পের মধ্য দিয়ে তাদের কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছেন উঠোনের এক কোণে। বৃদ্ধরাও তাদের অভিজ্ঞ হাতে বাঁশের ফালি তৈরির কাজে ব্যস্ত। এমনকি বসে নেই গ্রামের শিশুরাও; স্কুলের পাঠ শেষে তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এই কাজে কচি হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাত-দিন বছরজুড়ে চলে এ কুটির শিল্পের কাজ। প্রতি সপ্তাহে এসব তৈরি পণ্য পাইকাররা সরাসরি বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যান। আবার অনেকে নিজেই এসব সামগ্রী নিয়ে স্থানীয় হাটে গিয়ে বিক্রি করেন। স্থানীয় বাজার ছাড়াও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় তাদের তৈরি পণ্যগুলো বিক্রি করা হয়।
নারী কারিগর সাধই বিবি বলেন, আমরা সারা বছর এই কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সরকারিভাবে আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ কিংবা সহায়তা প্রদান করা হয় না।
গ্রামের প্রবীণ কারিগর মনুফর আরী জানান, এটি তাদের পূর্বপুরুষের পেশা। তিনি তার মা-বাবার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছেন এবং গ্রামের সবাই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বাঁশের বেত দিয়ে নিত্য ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমেই তারা সংসার চালান। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের অধিক ব্যবহারসহ নানা কারণে এ শিল্প আর আগের মতো লাভজনক নেই।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির হোসেন ধলা মিয়া বলেন, রাজাপুর গ্রামের মানুষের আয়ের প্রধান উৎসই হচ্ছে এই কুটির শিল্প। ঐতিহ্যের এ শিল্পটি এখনো তারা ধরে রেখেছেন। তবে এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে তাদের প্রশিক্ষণ এবং ঋণসহায়তাসহ সব ধরনের সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া আমাদের প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কথা হলে বিশ্বনাথের নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ বিন কাশেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি এই গ্রামটির বিষয়ে মাত্রই অবগত হয়েছি। আমি গ্রামটি পরিদর্শন করে দেখব।
