চব্বিশ বছরের এক অভিশপ্ত ইতিহাস যেন পিছু ছাড়ছিল না সেলেসাওদের। নকআউটে একবার গোল হজম করলেই যেন মাঠ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় ব্রাজিলের। ২০০২ সালের সেই ইংল্যান্ড বধের পর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়, কিন্তু এই বৃত্ত থেকে বের হতে পারছিল না ব্রাজিল। হিউস্টনে জাপানের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে যখন পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা গোল খেয়ে বসল, তখন গ্যালারিতে কোটি ভক্তের মনে আবারও সেই চেনা শঙ্কার কালো মেঘ জমে উঠেছিল। সবার মনেই প্রশ্ন ছিল, তবে কি আবারও নকআউট থেকেই বিদায় নিতে হচ্ছে তাদের?
কিন্তু ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা চুইংগাম চিবানো ইতালিয়ান ভদ্রলোক কার্লো আনচেলত্তি যেন অন্য ধাতুতে গড়া। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও যার বিশ্বাসে এতটুকু চির ধরেনি। বিরতির পর ড্রেসিংরুমে চাণক্য আনচেলত্তির একটাই মন্ত্র ছিল, ‘ধৈর্য হারিও না, গোল আমরা পাবই!’ গুরুর সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিতেই দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বের হলো এক অন্য ব্রাজিল। ৫৬ মিনিটে অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরোর বুলেট হেডারে সমতায় ফিরল দল। এরপর ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে, পঁচানব্বই মিনিটে গাব্রিয়েল মার্তেনেল্লির সেই জাদুকরী গোল! গ্যালারিতে তখন আনন্দের সুনামি, আর মার্তেনেল্লি নিজে যেন তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কী অবিশ্বাস্য কাণ্ডটাই না তিনি ঘটিয়ে ফেলেছেন।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তির চোখে-মুখে সেই চেনা রিল্যাক্সড হাসি। রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে বসে এমন বহু রূপকথার জন্ম দিয়েছেন তিনি, তাই তো বললেন দলের কেউ নাকি বিশ্বাস হারায়নি যে গোল আসবে না। তবে এই রোমাঞ্চকর জয়ের রাতেও ভক্তদের মনে একটা খটকা থেকেই গেছে, ডাগআউটে পুরো সময় বসে থাকা নেইমারকে কেন নামানো হলো না? আনচেলত্তি অবশ্য রহস্যের জট খুলেছেন নিজেই। তিনি জানিয়েছেন, ম্যাচ যদি অতিরিক্ত সময়ে গড়াত, তবেই মাঠে নামতেন নেইমার। কিন্তু ক্যাসেমিরো-মার্তেনেল্লিরা নির্ধারিত সময়েই কাজ সেরে ফেলায় আর কৌশল বদলানোর ঝুঁকি নেননি ডন কার্লো।
জাপানের সুশৃঙ্খল রক্ষণ ভেঙে এই কষ্টার্জিত জয়কে ক্যাসেমিরো দেখছেন ধৈর্যের ফসল হিসেবে। তবে রোমাঞ্চকর এই রূপকথার রাতের শেষেও ব্রাজিলের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ম্যাচ শেষে চোটের মিছিলে যোগ দিয়েছেন খোদ গোলদাতা ক্যাসেমিরো এবং লুকাস পাকেতা। শেষ ষোলোর মহাযুদ্ধের আগে এই দুই তারকার চোট কতটা গুরুতর, তা জানতে এখন পুরো ব্রাজিলিয়ান শিবিরের চোখ চব্বিশ ঘণ্টার মেডিকেল রিপোর্টের দিকে। ইতিহাস ভেঙে ব্রাজিল তো ঘুরে দাঁড়ালো, কিন্তু চোটের এই নতুন ধাক্কা সামলে আনচেলত্তির সেনারা হেক্সার মিশনে কতদূর যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়!
