ছয় জেলায় সেনা মোতায়েন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা রোধে সরকার দেশের ছয়টি জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না হলেও, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার সবসময়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ এই মাফিয়া বাহিনী আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় তাদের মিছিল-মিটিং করার মতো কিছু কার্যক্রম দেখা গেছে, যা থেকে মনে হয়েছে তারা হয়তো অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। এ বিবেচনায় সব বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।
সেনা মোতায়েনের কারণ ও সময়কাল
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ আইন অনুযায়ী ঢাকা মেট্রো, চট্টগ্রাম মেট্রো, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর মেট্রো এবং এর বাইরে গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় সেনা সদস্যরা মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা মোকাবিলায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-২ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতেও সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে নাশকতা রোধে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এই নির্দেশ কার্যকর থাকবে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষার লক্ষ্যে সেনাসদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত চিঠির ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসনের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।
পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতার প্রশ্ন নাকচ
পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখানে আস্থা-অনাস্থার প্রশ্ন আসে কেন? আমাদের পুলিশ বাহিনী অনেক কৃতিত্বপূর্ণ কার্যক্রম করেছে এবং তাদের অর্জনগুলো পুরস্কৃত করা হয়েছে। দু-একটি জায়গায় যেখানে শৃঙ্খলাপন্থী কর্মকাণ্ড হয়েছে, সেখানে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এখানে আস্থাহীনতার কোনো বিষয় নেই। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ হিসেবে মাঝে মধ্যে বিজিবি এবং মাঝে মধ্যে সেনা সদস্যদের নিয়োগ করা হয়, যা একটি রুটিন কাজ।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
নারায়ণগঞ্জ-৩ এমপির ছেলের জিজ্ঞাসাবাদ
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির একজন ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল এবং মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির ছেলের কি কোনো বিশেষ অধিকার আছে? আইনের চোখে সবাই সমান। পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল, সেগুলোর জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রয়োজন মনে করে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পূজা উদযাপন পরিষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাতে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু ভাইবোনদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে একজন সনাতন ধর্মের নারী যিনি আলাদা প্রদেশ চেয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হয়তো এটি তার ‘স্লিপ অব টাং’ হতে পারে বা অনেকেই অনেক সময় বক্তৃতা দেওয়ার সময় অতি উৎসাহে অনেক কিছু বলে ফেলেন।
অপরাধ পরিস্থিতি ও বিরোধী দলের সমাবেশ
মন্ত্রী আরও বলেন, সত্যিকারের তথ্য ও রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায়, অন্যান্য বছর এবং মাসওয়ারি অপরাধ চিত্র এই সময়ে অনেক কম। বিরোধীদল ১১ দলের ব্যানারে সমাবেশ করছে, যা গণতন্ত্র বিকশিত হওয়ারই প্রমাণ। তারা তাদের কথা বলবে, তারা স্বাধীন। সরকারও মাঠে তাদের কথা বলবে।
রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং নগরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে পুরো ঢাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিএমপির গণমাধ্যম শাখা থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীজুড়ে ২০০টিরও বেশি কৌশলগত স্থানে পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট ডিউটি পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহানগরের সবকটি প্রবেশপথে কড়া চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার থাকবে, যাতে কোনো বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারেন।
পুলিশ আরও জানায়, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় থাকবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট। এর মধ্যে ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) এবং সিটিটিসি (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) ইউনিট সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি যেকোনো ধরনের আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং আইএডি (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন) ব্যাপক গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

