দীর্ঘ ছয় মাসের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। আগামী বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রকল্পটিসহ মোট নয়টি উন্নয়ন প্রস্তাব উত্থাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে পরিকল্পনা বিভাগ।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদিত হলে এর নকশায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ যুক্ত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাইপাইল ইন্টারচেঞ্জ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে যাতায়াতের সুবিধা এবং নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১ বা পাতাল মেট্রোরেলের সাথে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সংযোজন রাজধানী ও এর আশপাশের সড়ক নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
প্রকল্পটির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল অনুমোদনের সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা প্রথম সংশোধনীতে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকায়। এবার দ্বিতীয় সংশোধনীতে অতিরিক্ত ৯ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ফলে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২৬ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। এটি মূল প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় ৫৫ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, ভ্যাট ও আয়কর কাঠামোর পরিবর্তন, কাস্টমস শুল্ক বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং পরামর্শক সেবার ব্যয় ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণকে দায়ী করা হয়েছে। প্রকল্পটি সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে পাঁচ হাজার ৯৫১ কোটি ৪১ লাখ এবং চীনের ঋণ থেকে ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর কাওলা থেকে আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো, বাইপাইল ও সাভার ইপিজেড হয়ে শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলগামী যানবাহনের রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় অনেক কমে আসবে। পাশাপাশি বিমানবন্দর এলাকা, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, এশিয়ান হাইওয়ে এবং জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
ঋণচুক্তি সম্পন্ন হতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পে ১১ হাজার ৭৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যার আর্থিক অগ্রগতি ৬৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বাস্তবায়নকারী সংস্থার তথ্যমতে, প্রকল্পের ভৌত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৫৮ দশমিক পাঁচ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
একনেকের এই বৈঠকে এক্সপ্রেসওয়ে ছাড়াও ভোলা জেলার নদীভাঙন প্রতিরোধ, বৃহত্তর দিনাজপুরে উন্নয়ন, দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন, সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস সুবিধা সম্প্রসারণের মতো আটটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
প্রকল্পটির অগ্রগতি বিবেচনায় সময়সীমাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঋণচুক্তি সম্পন্ন হতে দীর্ঘ বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের কাজ পিছিয়ে যায়। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। বর্তমানে অবশিষ্ট নির্মাণ শেষ করতে আরো চার বছর সময় চেয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত নতুন সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

