ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত সচেতনতা কর্মসূচি উদ্বোধন
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, মশা মশার কাজ করছে, মানুষ হিসেবে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করছেন কিনা? ঝোপঝাড় ও জমে থাকা পানিতেই লুকিয়ে আছে জীবন সংহারী ডেঙ্গু। এবার ডেঙ্গু প্রতিরোধে গাজীপুরে সমন্বিত সচেতনতা কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন তিনি।
গতকাল শনিবার জেলা প্রশাসন গাজীপুর, গাজীপুর সিটি করপোরেশন, সিভিল সার্জন অফিস এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক র্যালী পরবর্তী সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। এদিন সকালে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক র্যালী শুরু হয়। র্যালীটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে এসে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহতা ও প্রতিকার
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু কোনো সাধারণ জ্বর নয়, এটি একটি প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। এডিস ইজিপ্টাই নামক স্ত্রী মশার কামড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস একজন থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায়। এই মশা সাধারণত লার্ভা বা ডিম পাড়ার জন্য অপরিষ্কার ড্রেন নয়, বরং ঘরের ভেতরের বা আশপাশের “স্বচ্ছ ও স্থির পানি” বেছে নেয়। মাত্র এক চা-চামচ জমানো পানিতেও এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
কামড়ানোর পর ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রক্তের প্লাটিলেট (রক্তকণিকা) দ্রুত কমিয়ে দেয়। সাধারণ ডেঙ্গু থেকে এটি যখন ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’ বা ‘টক্সিক শক সিন্ড্রোম’-এ রূপ নেয়, তখন মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ যেমন—লিভার, কিডনি বা ফুসফুসে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে চোখের পলকে রক্তচাপ কমে গিয়ে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। প্রতি বছর হাজারো পরিবার তাদের কর্মক্ষম সদস্য বা আদরের সন্তানকে হারিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কেবল একটি মশার কামড়ে।
প্রতিকার ব্যবস্থার উপর জোর
সমাবেশে চিকিৎসা কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে তিন স্তরের প্রতিকার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে উৎস ধ্বংস সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ঘরের ফুলের টব, ভাঙা প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা, টায়ার, কিংবা ছাদবাগানে যেন ৩ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া দিনের বেলা (বিশেষ করে সকালে ও সন্ধ্যায়) শরীর ঢাকা পোশাক পরা, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা এবং মশা তাড়ানোর ক্রিম বা লিকুইড ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়। লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করার উপর জোর দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এতে রক্তক্ষরণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জেলা প্রশাসকের আহ্বান
সমাবেশে সবার উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, আজ এই দিন থেকে সবাই নিজ নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্যবহার করবেন। কারণ আপনার আঙিনা, আশপাশ, বাড়িঘর এবং রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা সম্পূর্ণ আপনার নিজের দায়িত্ব। এই নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে আমরা ব্যর্থ হলে, জীবনসংহারী ডেঙ্গু মশা আপনাকে এবং আপনার স্বজনদের শেষ করে দেবে। সুতরাং, মশা জন্মাতে পারে এমন পানি যাতে কোনোভাবেই জমে না থাকে সেদিকে কঠোর খেয়াল রাখতে হবে। নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে নিজেকে নিরাপদ রাখুন এবং অন্যদের নিরাপদ রাখতে নাগরিক দায়িত্ব পালন করুন।
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী
যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আমিনুল ইসলাম এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সোহেল রানা। এছাড়াও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বেলায়েত হোসেন, উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) আহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়া, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহরিয়ার নজির এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজ্জাত হোসেন সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
